দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদ্যমান ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সময়মতো গ্যাস আমদানি নিশ্চিত করা এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বড় আকারের উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জ্বালানি সংকট নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র এবং ২০২৯ সাল পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি ও ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
সভায় গ্যাস, জ্বালানি তেল, কয়লা ও ফার্নেস তেলের চাহিদা ও সরবরাহের পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা এবং বিভিন্ন জ্বালানি ব্যবহার করে কত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সাংবাদিকদের বলেন, আগামী শীতকালের মধ্যে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং পরবর্তী গ্রীষ্মকালের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দৃশ্যমান অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়ছে
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সরকার ৯০ দিনের মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত যেসব জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে, সেগুলোর চালান সময়মতো দেশে পৌঁছালে মজুদের পরিমাণ ৫৭ দিনে উন্নীত হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল মাত্র ১৪ দিনের।
অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সীমিত। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কমিয়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর পথকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ খাতে কিছুটা বেশি ব্যয় বা ভর্তুকি বহনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এলএনজি আমদানিতে সরাসরি ক্রয় এড়ানোর নির্দেশ
বিদ্যমান দুটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনালের সক্ষমতা অনুযায়ী আমদানি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ দেওয়া ছয়টি গ্যাসবাহী জাহাজ বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়নি। বিদেশি সরবরাহকারীরা বেশি দামে সেগুলো অন্য দেশে বিক্রি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে এ ধরনের পদ্ধতিতে আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অনিয়মের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমদানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রূপপুর চালু হলে কমবে গ্যাসের চাপ
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
স্বল্পমেয়াদে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, এক মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে গ্যাসের একটি অংশ শিল্পসহ অন্য খাতে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ
দেশীয় উৎসের গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পাইপলাইন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। একটি গ্যাসবাহী জাহাজের চালান কিনতেই প্রায় ৭৩০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সেই তুলনায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছে জ্বালানি বিভাগ।
দেশের গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ২০২৯ সালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অতিরিক্ত ১,৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছে জ্বালানি বিভাগ। দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়াতে কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি উৎস খোঁজা হচ্ছে
গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে কোনো একটি অঞ্চল বা উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন খাতে মোট ৫,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের অনুমোদিত চাহিদা রয়েছে। নিয়মিতভাবে ৩,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হলে অধিকাংশ খাত মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। আর সরবরাহ ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা গেলে বড় ধরনের ঘাটতি থাকবে না বলে বিভাগটি জানিয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২,৬০০ থেকে ২,৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেই প্রায় ১,৫৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যাচ্ছে, যা মোট সরবরাহের প্রায় ৬২ শতাংশ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৫৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে।
বাকি প্রায় ৩৮ শতাংশ গ্যাস শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন ও আবাসিক খাতে সরবরাহ করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমানো গেলে শিল্পসহ অন্যান্য খাতে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
২০১৮ সাল থেকে কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে গ্যাস আমদানি শুরু করে। তার আগে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই জাতীয় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব হতো। ২০১৮ সালে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২,০০০ থেকে ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত।
পরবর্তী সময়ে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে চাহিদা বাড়লেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়েনি। বরং কয়েক বছর ধরে উৎপাদন কমেছে। বর্তমানে দেশের গ্যাসকূপগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ১,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা তার কাছাকাছি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় কূপের উৎপাদন বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন টার্মিনালগুলো যুক্ত হলে আমদানির সক্ষমতা বাড়বে এবং সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের পরিকল্পনায় তাই একদিকে কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমানো, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো এবং বহুমুখী উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।


