ঘরের মাঠে বিদায় না নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেন ম্যাক্সওয়েল

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা অলরাউন্ডার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সময় তাঁর মনে রয়ে গেছে একটি আক্ষেপ। নিজের ঘরের মাঠ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামার ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাবেন ৩৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট থেকেও অবসর নিচ্ছেন ম্যাক্সওয়েল। তবে বিগ ব্যাশ লিগে (বিবিএল) তাঁর উপস্থিতি থাকছে। ২০২৭-২৮ মৌসুম পর্যন্ত মেলবোর্ন স্টার্সের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছেন তিনি। ফলে আগামী কয়েক মৌসুম অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় এই তারকা অলরাউন্ডারকে দেখা যাবে।

এর আগে গত বছরের জুনে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট চালিয়ে যান এবং এ বছর অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেন। যদিও সেই আসরে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় দলটিকে। পাল্লেকেল্লেতে ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটিই হয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে ম্যাক্সওয়েলের শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি।

‘ফাইনাল ওয়ার্ড’ পডকাস্টে নিজের অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। ম্যাক্সওয়েল জানান, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ও পরে অস্ট্রেলিয়ার টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে তাঁর একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা বা চাপ ছিল না। বরং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দল পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

ম্যাক্সওয়েলের ভাষায়, অস্ট্রেলিয়া সামনে কয়েকটি সিরিজে তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ দিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ সফরেও সেই পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা গেছে। সেখানে নতুন খেলোয়াড়েরা সুযোগ পেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করেছেন। তাঁর মতে, জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তরুণদের জায়গা করে দেওয়া এখন জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েলের অবদান বিবেচনা করলে তাঁর বিদায় নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি। ২০১৫ ও ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন এই অলরাউন্ডার। বিশেষ করে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, দ্রুত রান তোলার দক্ষতা এবং কার্যকর স্পিন বোলিংয়ের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি।

তবে এত অর্জনের পরও বিদায়বেলায় একটি অপূর্ণতা তাঁকে ভাবাচ্ছে। নিজের শহর মেলবোর্নের এমসিজিতে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শেষ ম্যাচ খেলার ইচ্ছা ছিল তাঁর। এ নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।

এ বিষয়ে ম্যাক্সওয়েল বলেন, এমসিজিতে একটি বিদায়ী ম্যাচ খেলার ছোট্ট আশা তাঁর ছিল। তবে অস্ট্রেলিয়া দল যে পথে এগোচ্ছে, সেটিও তিনি বুঝতে পারছেন। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে নতুন ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় করে দেওয়া প্রয়োজন।

২০২৮ সালের অলিম্পিককে সামনে রেখেও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। তাঁর ধারণা, আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে দলের পরিকল্পনা ও খেলোয়াড় নির্বাচনে বেশ কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তরুণদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রস্তুত করার জন্য শুধু বিগ ব্যাশের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপ ও পরিবেশের সঙ্গে তাদের পরিচিত করানোও গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েলের ব্যস্ততা কমছে না। গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপিয়ান টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগে বেলফাস্ট উলভসকে নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ওয়ানডে কাপে ভিক্টোরিয়ার হয়ে দুটি ম্যাচ খেলেন। তবে ভিক্টোরিয়ার হয়ে শেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলার পর সতীর্থদের নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর মুহূর্তটি তাঁর জন্য আবেগপূর্ণ ছিল।

ম্যাক্সওয়েল জানান, ভিক্টোরিয়ার সতীর্থদের সামনে শেষ ম্যাচের কথা বলতে গিয়ে তাঁর গলা ধরে এসেছিল। বিষয়টি নিজের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কঠিন মনে হয়েছিল। দীর্ঘদিনের সতীর্থদের সঙ্গে এমন বিদায়ী মুহূর্ত স্বাভাবিকভাবেই আবেগ তৈরি করেছে।

এখন ক্যারিয়ারের বাকি টুর্নামেন্টগুলো ভালোভাবে শেষ করাই তাঁর লক্ষ্য। সে জন্য শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। বয়স ও দীর্ঘদিনের ক্রিকেটীয় ব্যস্ততা বিবেচনায় ফিটনেস ধরে রাখাকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই অলরাউন্ডার।

চলতি মাসে সাদা বলের সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাওয়ার কথা ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের। টি-টোয়েন্টি সিরিজের একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেলবোর্নে। সেই ম্যাচে খেলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর ইচ্ছা ছিল ম্যাক্সওয়েলের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি জানান, মেলবোর্নে খেলার সুযোগ থাকলেও বিগ ব্যাশের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমনকি বিগ ব্যাশে খেলার উপযোগী হতে হাঁটুতে ইনজেকশন নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছিলেন। তবে মেলবোর্নে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা তৈরি না হওয়ায় শরীরের যত্ন নেওয়ার বাড়তি সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

বিদায় নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ম্যাক্সওয়েল স্বীকার করেন, মনে মনে হয়তো একটি রূপকথার মতো সমাপ্তির প্রত্যাশা করেছিলেন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে নিজের প্রধান পরিচয়ের অংশ মনে করেছেন তিনি। তাই অন্য কোনো সংস্করণে নয়, এই ফরম্যাটেই বিশেষ একটি বিদায়ী মুহূর্ত চেয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাক্সওয়েলের পরিসংখ্যান

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অসাধারণ পারফরম্যান্স রয়েছে ম্যাক্সওয়েলের। ১৩০টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১৫৪.৪২ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ২ হাজার ৮৯৭ রান। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এই সংস্করণে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় তাঁর অবস্থান তৃতীয়। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বল হাতেও অবদান রেখেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর শিকার ৫১ উইকেট।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করার ক্ষেত্রেও বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে ম্যাক্সওয়েলের। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর সেঞ্চুরি পাঁচটি, যা ভারতের রোহিত শর্মার সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্ব রেকর্ড।

টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সাতটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। সেখানে ৩৩৯ রান করার পাশাপাশি একটি সেঞ্চুরি রয়েছে তাঁর। অন্যদিকে ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৪৯ ম্যাচে ৩৩.৮১ গড়ে করেছেন ৩ হাজার ৯৯০ রান। এই সংস্করণে তাঁর সেঞ্চুরি চারটি।

ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ার কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করার নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা, ব্যাটিংয়ে উদ্ভাবনী শট এবং চাপের মুহূর্তে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার মানসিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর অধ্যায় শেষ হলেও ক্রিকেট থেকে এখনই পুরোপুরি সরে দাঁড়াচ্ছেন না ম্যাক্সওয়েল। মেলবোর্ন স্টার্সের হয়ে বিগ ব্যাশে খেলাই আপাতত তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য। তবে এমসিজিতে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার অপূর্ণ ইচ্ছাটি যে বিদায়বেলায় তাঁর মনে থেকে যাবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন নিজেই।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।