খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় গভীর রাতে সংঘটিত এক ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনায় রিগান আক্তার মিম (২৬) নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন পরিবারের আরেক গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তার (২৪)। নৃশংস এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে এবং জড়িতদের শনাক্তে একাধিক দল কাজ করছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে শাহরাস্তি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাত্তলা গ্রামের বেপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রিগান আক্তার মিম ছিলেন মৃত সেলিম বেপারীর পুত্রবধূ। তিনি আড়াই বছর বয়সী কন্যা সাইফা এবং মাত্র চার মাস বয়সী ছেলে সিরাজের মা। তার স্বামী রনি ঢাকায় চাকরি করেন। ঘটনার সময় বাড়িতে দুই গৃহবধূ, পরিবারের প্রবীণ সদস্য নুরুল ইসলাম এবং তিনটি শিশু অবস্থান করছিল।
আহত সুমাইয়া আক্তার জানান, রাত ১২টার দিকে তিন মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে তিনি নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। গভীর রাতে মুখ বাঁধা দুই ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করে ছুরির মুখে তাকে ও তার শিশুকে জিম্মি করে। তারা ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র কোথায় রাখা আছে তা জানতে চায়। প্রাণভয়ে তিনি আলমারিতে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে যেতে বলেন। এরপর দুর্বৃত্তরা তার ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে ফেলে এবং হাতুড়ি দিয়ে মাথায় দুই দফা আঘাত করে। পরে তার কানের দুল, আলমারিতে থাকা আরেক জোড়া দুল এবং একটি আংটি নিয়ে পাশের কক্ষে প্রবেশ করে।
সুমাইয়া বলেন, কিছুক্ষণ পর পাশের কক্ষ থেকে তার বড় জায়ের কান্না ও চিৎকার শুনতে পান। কিন্তু হাত বাঁধা থাকায় তিনি কোনোভাবেই তাকে সাহায্য করতে পারেননি। অসহায় অবস্থায় তিনি শুধু চিৎকার শুনে আতঙ্কে অপেক্ষা করছিলেন।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, রাতে তিনি বাড়ির লোহার গেটে তালা লাগিয়ে চাবি ঘরের টেবিলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ চিৎকার শুনে জেগে উঠে গেট খুলতে গেলে দেখেন, গেটটি ভেতর থেকে আটকানো থাকলেও তালাটি নেই। পরে বাড়ির বাইরে তালাটি অক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিষয়টি কীভাবে ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন জানান, মিমের ঘর থেকে আর্তচিৎকার শুনে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ঘরের ভেতর ধস্তাধস্তির শব্দ পেলেও জানালায় ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া পাননি। তখন ডাকাতির আশঙ্কায় আশপাশের লোকজনকে খবর দেন। পরে মসজিদের মাইকে ডাকাত পড়ার ঘোষণা দেওয়া হলে স্থানীয়রা দ্রুত বাড়িটি ঘিরে ফেলেন।
স্থানীয়রা বাড়ির পূর্ব পাশের একটি জানালার কপাট খোলা দেখতে পান। জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে তারা মিমকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে চেয়ারম্যান, যিনি পরিবারের দাদা শ্বশুর, গেট খুলে দিলে সবাই ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে ছোট গৃহবধূ সুমাইয়াকে হাত বাঁধা অবস্থায় কান্নারত দেখতে পান। অপর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, রিগান আক্তার মিম অচেতন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন এবং তার গলায় ওড়না পেঁচানো। স্থানীয়রা দ্রুত ওড়না খুলে তাকে জাগানোর চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসা চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিহতের বাবা-মা, ভাই-বোনসহ স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। মায়ের নিথর দেহের পাশে দুই ছোট্ট সন্তানকে জড়িয়ে ধরে স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কয়েক মাস বয়সী শিশু সন্তান ও আড়াই বছরের কন্যাশিশুকে ঘিরে স্বজনদের কান্না উপস্থিত সবাইকে শোকাহত করে তোলে।
ঘটনার খবর পেয়ে শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান এবং সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কচুয়া সার্কেল) মো. আব্দুল হাই চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
ওসি মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। কীভাবে ডাকাতরা বাড়িতে প্রবেশ করেছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক তদন্ত দল মাঠে রয়েছে। ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।