চাঁদপুর শহরে ব্যবসায়ী পিন্টু দাস, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। নিখোঁজ চারজন হলেন—চাঁদপুর শহরের এসকে শিল্পালয়ের স্বত্বাধিকারী পিন্টু দাস, তাঁর স্ত্রী রিমি দাস, বড় ছেলে প্রিয়ম দাস এবং ছোট ছেলে রুপম দাস।
বুধবার (২৬ আগস্ট) পিন্টু দাসের নিকটাত্মীয় ও চাঁদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাত্র ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক উপমা দে তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পিন্টু দাস স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চাঁদপুর শহরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। বিভিন্ন কারণে তিনি আর্থিক সংকটে ছিলেন বলে স্বজনদের কাছ থেকে জানা গেছে। সম্প্রতি পাটোয়ারী বাড়ির এক ব্যক্তি তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছিলেন বলেও পরিবারের সদস্যদের কাছে তথ্য ছিল। এর পর থেকেই স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ পিন্টু দাসের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি স্বজনদের।
তবে পিন্টু দাসের ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, তিনি স্বর্ণ বন্ধক রেখে অর্থ দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে স্বর্ণ বন্ধক নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে তা ফেরত দিতে না পারায় তাঁর ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি ব্যবসার জন্য বিভিন্ন সমিতি থেকেও ঋণ নেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একাধিক জায়গায় ব্যবসার স্থান পরিবর্তনের পর পিন্টু দাস সর্বশেষ চাঁদপুর শহরের মদিনা মার্কেটের নিচতলায় ‘এসকে শিল্পালয়’ নামে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন। সেখানে বন্ধক রাখা স্বর্ণের প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় কম অর্থ দেওয়া হতো বলেও কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রঘুনাথপুরের বাসিন্দা মনসুর খানের ছেলে রাসেল খান দাবি করেন, তিনি পিন্টু দাসের কাছে আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার ৫০ হাজার টাকায় বন্ধক রেখেছিলেন। পরে সেই ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণালংকার নিতে গেলে পিন্টু দাস তাঁকে পরদিন আসতে বলেন। কিন্তু এরপরই তিনি পিন্টু দাসের সপরিবারে নিখোঁজ হওয়ার খবর জানতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি থানায় অভিযোগ করেছেন বলেও জানান।
দক্ষিণ গুণরাজদীর বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম জানান, তিনি পিন্টু দাসের কাছে ১২ আনা স্বর্ণ বন্ধক রেখেছিলেন। একইভাবে শুভঙ্কর মজুমদার ১০ আনা স্বর্ণ বন্ধক রাখার দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে পিন্টু দাস মদিনা মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন।
পিন্টু দাসের মূল বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বলে জানা গেছে। কুমিল্লা ও মুদাফফরগঞ্জ এলাকায় তাঁর আত্মীয়স্বজন রয়েছেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে চারজনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি স্বাভাবিক নিখোঁজ, নাকি তাঁরা কোনো কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন—এ নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়েও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার ফেরদৌস বলেন, পিন্টু দাস যদি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজেই আত্মগোপনে থেকে থাকেন, তাহলে তাঁকে খুঁজে বের করা কঠিন হতে পারে। এ বিষয়ে থানায় কেউ অভিযোগ করেছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, পিন্টু দাসসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তিনি সদ্য জানতে পেরেছেন। ঘটনাটি তদন্ত করে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত এবং উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশের তদন্তে পিন্টু দাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ এবং তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে স্বর্ণ বন্ধক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে স্থানীয়দের করা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


