চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় পাচার, গোপালপুরের তিন যুবক নিখোঁজ

নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি গড়ে ১০ লাখ টাকা নিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। এ ঘটনায় ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গুরুতর আহত হয়ে দুজন দেশে ফিরেছেন, দুজন মস্কোয় চিকিৎসাধীন। বাকি ছয়জনের কোনো খোঁজ নেই। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবক। তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে না পেরে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো।

নিখোঁজ তিন যুবক হলেন গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের মৃত কছর উদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম, মজিদপুর গ্রামের পরেশ চন্দ্র সূত্রধরের একমাত্র ছেলে পবিত্র চন্দ্র এবং বীর নলহরা গ্রামের মৃত ইসমাইলের ছেলে নজরুল ইসলাম। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের সন্ধান না পেয়ে তাঁদের স্বজনেরা এখন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কারও সংসারে ঋণের বোঝা, কারও পরিবারে ছোট ছোট সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা। সবচেয়ে বড় কষ্ট, স্বজনেরা বেঁচে আছেন, নাকি যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন—সেই প্রশ্নেরও নিশ্চিত উত্তর মিলছে না।

চাকরির আশ্বাসে বিদেশযাত্রা, পরিণতি যুদ্ধক্ষেত্রে

গত ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি জানায়, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে গিয়ে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার আশায় তাঁরা বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছিলেন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের সঙ্গে কী ঘটেছে, তা নিয়ে এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানে আরও ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার কাজে এসব বাংলাদেশিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হতো। তাঁদের অবস্থান লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব নির্ণয়ে সুবিধা হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং কী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশিরা রুশ সেনাবাহিনীর হাতে পৌঁছালেন, তা নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। গুরুতর আহত দুজন দেশে ফিরেছেন এবং আরও দুজন মস্কোয় চিকিৎসাধীন। বাকি ছয়জন নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে গোপালপুরের আমিনুল ইসলাম, পবিত্র চন্দ্র ও নজরুল ইসলাম রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় তাঁদের পরিবারের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

ঋণের বোঝা নিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় আছমা

নজরুল ইসলামের স্ত্রী আছমার জীবনে এখন নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে একদিকে যেমন আর্থিক সংকটে পড়েছেন, অন্যদিকে স্বামীর কোনো খবর না পাওয়ার মানসিক চাপও তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও ও ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন তিনি। আশা ছিল, বিদেশে কাজ করে সংসারের অভাব ঘোচাবেন নজরুল। কিন্তু সেই আশার জায়গায় এখন শুধুই উৎকণ্ঠা।

আছমা জানান, প্রায় চার মাস ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না তিনি। ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, সন্তানদের কীভাবে বড় করবেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও তাঁর জানা নেই।

তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ছোট অবুঝ শিশুদের দায়িত্ব কে নেবে? অনেকের কাছ থেকে ঋণ করে টাকা এনে তাকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছি। চার মাস ধরে কোনো খবর পাচ্ছি না। সরকারের কাছে আবেদন, তিনি মারা গিয়ে থাকলে তার লাশ যেন ফিরিয়ে আনা হয়। আর যারা প্রতারণা করেছে, তাদের বিচার চাই।’

আছমার এই আকুতি শুধু একজন স্ত্রীর ব্যক্তিগত কষ্টের প্রকাশ নয়; বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় অর্থ ব্যয় করে বিপদে পড়া একটি পরিবারের অসহায়ত্বও এতে উঠে এসেছে। স্বামীর সন্ধান পাওয়ার পাশাপাশি তিনি চান, যাঁদের প্রলোভনে পড়ে তাঁর পরিবার ঋণের বোঝা নিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

ছেলের ভাগ্যে কী ঘটেছে, জানেন না বাবা

পবিত্র চন্দ্রের পরিবারেও একই পরিস্থিতি। তাঁর বাবা পরেশ চন্দ্র সূত্রধর জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর পেলেও সরকারি পর্যায়ে এর সত্যতা নিশ্চিত হতে পারেননি। ফলে ছেলের মৃত্যু হয়েছে কি না, নাকি তিনি কোথাও বেঁচে আছেন—এ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

পরেশ চন্দ্রের ভাষ্য, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তাঁর ছেলে। চাকরি করে সংসারের হাল ধরবেন, পরিবারের সদস্যদের আর্থিক স্বস্তি দেবেন—এমন প্রত্যাশা থেকেই তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধ করার জন্য ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠাননি তিনি।

পরেশ চন্দ্র বলেন, ‘আমার ছেলে আমাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমি ছেলেকে চাকরি করতে পাঠিয়েছি, যুদ্ধ করতে পাঠাইনি। আমার ছেলে জীবিত আছে, নাকি মারা গেছে, তার প্রকৃত খবর চাই। এখন আমার ছোট ছোট নাতি-নাতনিকে কে দেখবে?’

ছেলের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন মাধ্যমে শুনলেও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না পাওয়ায় তাঁর পরিবারের শোক, উদ্বেগ ও অপেক্ষা—সবকিছুই যেন একসঙ্গে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটির প্রধান দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন পবিত্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের জানায়।

আমিনুল ইসলামের পরিবারও একইভাবে তাঁর সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে তিন যুবকের প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পৃথকভাবে যাচাই করা তথ্য না থাকায় তাঁদের কারও বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অডিও ঘিরে উদ্বেগ

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কল রেকর্ড নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ওই অডিওতে গোপালপুরের নিখোঁজ তিন যুবকের মধ্যে দুজনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিষয়ে উদ্বেগজনক দাবি করা হয়।

অডিওতে নিজেকে জামালপুরের আরমান পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেন, রাশিয়ায় যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন এবং কয়েকজনকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। তবে অডিওতে উত্থাপিত দাবিগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এসব বক্তব্যকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

নিখোঁজ যুবকদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁদের স্বজনদের অবস্থান কিংবা মৃত্যুর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবি তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো দ্রুত তথ্য যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা জানাবে।

প্রতারণার অভিযোগ, আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষা

এ ঘটনায় বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে অর্থ সংগ্রহ, নিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নির্ধারণ এবং দায়ীদের শনাক্ত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং তাঁদের পরিবারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।

এ বিষয়ে গোপালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি অবগত নই। পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পরিবারগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা এখনো তাঁদের স্বজনদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের দাবি, রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন, কীভাবে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং বিদেশে যাওয়ার পর বাংলাদেশিরা কী পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে নিখোঁজ ছয় বাংলাদেশির সন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বিদেশে কাজের সুযোগের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে যাঁরা দেশ ছাড়েন, তাঁদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের শর্ত যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিয়োগকর্তা, কাজের ধরন, চুক্তিপত্র, ভিসা এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর কর্মীর আইনি অবস্থান সম্পর্কে আগাম নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে গোপালপুরের এই তিন পরিবারের কাছে এখন এসব সতর্কতার আলোচনা নয়, সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো তাঁদের প্রিয়জনদের প্রকৃত পরিণতি জানা।

নজরুলের স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর ফেরার আশায়, পবিত্রের বাবা ছেলের জীবিত থাকার একটি নির্ভরযোগ্য খবর চান, আর আমিনুলের পরিবারও তাঁর সন্ধান পাওয়ার প্রত্যাশায় দিন গুনছে। তাঁদের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য অনুসন্ধান—যাতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থা জানা যায় এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।