খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুন ২০২৬, ৪:৫১ পিএম
নামকরণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যেই বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার নবগঠিত চারটি ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারিভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) বগুড়া জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রাজিয়া সুলতানা এই ইউনিয়নগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। নতুন গঠিত এই চার ইউনিয়নের সীমানা বিন্যাস ও গেজেট প্রকাশের পর আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নবগঠিত ৪টি ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সচল রাখতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলার মূল ভূখণ্ডের অধীনে গঠিত ‘মীরবাড়ী’ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান।
অন্যদিকে, মোকামতলা এলাকা পুনর্গঠন করে যে ৩টি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে, সেগুলোতেও পৃথক কর্মকর্তা নিয়োজিত হয়েছেন। নবগঠিত ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, ‘সীমান্ত’ ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হোসাইন এবং ‘দিগন্ত’ ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আল মামুনকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দপ্তরের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই ইউনিয়নগুলোর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করবেন।
বগুড়ার এই চার নতুন ইউনিয়নের নামকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক গণঅসন্তোষ এবং জাতীয় পর্যায়ে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে এই নামগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিবগঞ্জের নতুন ইউনিয়নের নাম প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাসভবন ‘মীরবাড়ী’র নামানুসারে রাখা হয়েছে। একইভাবে, মোকামতলা উপজেলার অধীনস্থ নবগঠিত দুটি ইউনিয়ন ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’-এর নাম प्रतिমন্ত্রীর দুই ছেলে যথাক্রমে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধির পরিবারের সদস্যদের নামে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ইউনিটের নামকরণ করায় এলাকার সাধারণ মানুষ, সামাজিক সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
এই নামকরণের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর তা দেশজুড়ে আলোচিত হয় এবং গত সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অন্যান্য সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে দাঁড়িয়ে এই বিষয়ে নিজের ব্যক্তিগত কৈফিয়ত ও ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, এই নামগুলো সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মাঠ পর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে গণশুনানি করা হয়েছিল। সেই গণশুনানির ভিত্তিতেই স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এই নামগুলো মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব করা হয়। তাঁর সন্তানদের নামের সাথে ইউনিয়ন দুটির নামের মিল থাকার বিষয়টিকে তিনি ‘নিছকই কাকতালীয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি সংসদে আরও যুক্তি দেন যে, যদি তাঁর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানো হতো, তবে তিনি ইউনিয়নগুলোর নামের আগে ‘মীর’ শব্দ যোগ করার জন্য প্রস্তাব দিতেন।
সংসদে প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া এই বক্তব্যের সাথে স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগের বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা গেছে। এলাকার সাধারণ বাসিন্দা ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, এই নতুন ইউনিয়নগুলোর সীমানা নির্ধারণ কিংবা নামকরণের বিষয়ে সাধারণ মানুষ কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কোনো রূপ আলোচনা করা হয়নি। সরকারি নথিপত্রে যে গণশুনানির দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবে তেমন কোনো গণশুনানি বা সর্বসাধারণের মতামতের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, গোপনে এবং সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিতর্কিত নামগুলো গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯-এর ১৮ ধারা মোতাবেক কোনো নতুন ইউনিয়ন গঠিত হলে সেখানে প্রথম নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে এবং নাগরিক সেবা যেমন—জন্ম নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ ইত্যাদি সচল রাখতে সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শিবগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) প্রেরিত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পরই জেলা প্রশাসন এই নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষের আবহ তৈরি হলেও এই প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নতুন গঠিত চার ইউনিয়নের দাপ্তরিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।
মন্তব্য