খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
চলতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের কোনো সদস্যই আইনগতভাবে ঋণখেলাপি নন বলে জাতীয় সংসদে দৃঢ় দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে জানান, সংসদে অবস্থানরত সদস্যরা ঋণগ্রস্ত বা ব্যাংকের কাছে দেনাদার হতে পারেন, তবে তারা কোনোভাবেই খেলাপি নন। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের একটি পয়েন্ট অব অর্ডারের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে দেশের প্রচলিত নির্বাচনী আইন ও বিধিমালার বিভিন্ন দিক বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য আইনি বিধিমালায় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি দেশের আদালত কর্তৃক চূড়ান্তভাবে ঋণখেলাপি হিসেবে সাব্যস্ত বা ঘোষিত হন, তবে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাবেন।
এমন আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি সংসদ সদস্য পদের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেন না। এটি একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর আইনি বিধান। ফলে নিয়মতান্ত্রিক যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া পার হয়ে যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন, তাদের আইনগতভাবে ঋণখেলাপি বলার কোনো সুযোগ নেই।
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বিভিন্ন প্রার্থীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ব্যাংকের পাওনা সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্যে কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংক কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলা বা আপত্তি অতীতে থাকতে পারে। তবে সেই সমস্ত আইনি জটিলতা ও আপত্তিসমূহ নির্বাচন প্রক্রিয়ার পূর্বেই দেশের উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তির পর এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর কোনোভাবেই ঋণখেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকেন না। তারা সম্পূর্ণ বৈধ ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা সংসদে এসেছেন।
সংসদকে এবং এর সদস্যদের ঢালাওভাবে ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার কঠোর সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আসা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই সংসদকে কোনোভাবেই ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলা সঠিক নয় এবং এটি চরম মানহানিকর একটি বক্তব্য। এই ধরণের ঢালাও মন্তব্য সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। তিনি স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আইনগত ব্যাখ্যার সাথে অসংগতিপূর্ণ এই ধরনের মানহানিকর ও আপত্তিকর বক্তব্য মহান সংসদের কার্যবিবরণী থেকে সম্পূর্ণভাবে এক্সপাঞ্জ বা প্রত্যাহার করা উচিত।
এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদে ঋণখেলাপিদের উপস্থিতির বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেও তিনি এবং তাঁর দল ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মনোনয়ন দেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পরেও এই সংসদের প্রথম অধিবেশনের বক্তব্যে তিনি অনেক সংসদ সদস্যের বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কথা এই কক্ষেই উল্লেখ করেছিলেন। তবে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সম্মানের কথা বিবেচনা করে তিনি তখন কারও ব্যক্তিগত নাম প্রকাশ করেননি।
নাহিদ ইসলাম সংসদে তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আরও বলেন, বর্তমান সংসদে যদি বিপুল সংখ্যক ঋণখেলাপি ব্যক্তি অবস্থান করেন, তবে সাধারণ মানুষ এই সংসদকে স্বাভাবিকভাবেই ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করবে। বিশেষ করে সরকার দলীয় লোকেরা, যারা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ (টু-থার্ড) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন, তারা বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়ে সংসদে নিয়ে এসেছেন এবং এটি সাধারণ জনগণের মাঝে এক ধরণের নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। দুই পক্ষের এই যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির মধ্য দিয়ে সংসদে কিছুক্ষণের জন্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ঋণখেলাপি ইস্যুটি।