চীনা গোয়েন্দা যোগ নিয়ে ব্রিটিশ গবেষণায় সতর্কতা

যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এমআই৫ জানিয়েছে, চীনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শতাধিক শিক্ষাবিদ কাজ করেছেন। সংস্থাটির দাবি, প্রতিষ্ঠানটির চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় বা মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটির (এমএসএস) সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মাধ্যমে এমন গবেষণায় অর্থায়ন করা হয়েছে, যা চীনা গোয়েন্দা সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিরল জনসতর্কবার্তায় এমআই৫ ‘চায়না জেনারেল টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা সিজিটিআরআইয়ের নাম উল্লেখ করে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একাডেমিক গবেষণায় অর্থায়ন করা, যা চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা তৎপরতার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সরাসরি বাড়াতে পারে।

এমআই৫ বলেছে, সিজিটিআরআইয়ের অর্থায়নে যুক্তরাজ্য-সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদদের গবেষণার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, সাইবার নিরাপত্তা, গোপন যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্টেগানোগ্রাফি। স্টেগানোগ্রাফি এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো ছবি, ফাইল বা সাধারণ বার্তার ভেতরে অন্য তথ্য লুকিয়ে রাখা যায়। প্রযুক্তিটির বৈধ ও বেসামরিক ব্যবহার রয়েছে, তবে গোয়েন্দা যোগাযোগেও এ ধরনের পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।

তবে এই গবেষণায় যুক্ত প্রত্যেক শিক্ষাবিদ যে চীনা গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তা করার বিষয়টি জানতেন, এমন দাবি করেনি এমআই৫। বরং সংস্থাটি জানিয়েছে, অনেক শিক্ষাবিদ ও প্রতিষ্ঠান সৎ উদ্দেশ্যেই এসব গবেষণা সহযোগিতায় যুক্ত হয়ে থাকতে পারেন। কারণ সিজিটিআরআইয়ের সঙ্গে চীনা গোয়েন্দা কাঠামোর সম্পর্ক আগে স্পষ্ট ছিল না এবং কিছু ক্ষেত্রে গবেষকেরা জানতেনই না যে তাঁদের প্রকল্পে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানটি সিজিটিআরআই।

এই বিষয়টিই এমআই৫-এর সতর্কবার্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংস্থাটি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সরাসরি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যাচাই করার পরিবর্তে গবেষণার অর্থের শেষ উৎস কোথায়, সেটিও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। চলমান ও পরিকল্পিত সব ধরনের সিজিটিআরআই-সংশ্লিষ্ট গবেষণা সহযোগিতা অবিলম্বে পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রসঙ্গ

এমআই৫ সতর্ক করেছে, ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তার সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। সতর্কবার্তার পরও সিজিটিআরআইয়ের মাধ্যমে অর্থায়িত গবেষণায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলে তাদের নিজস্ব স্বাধীন আইনি পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি।

যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জার্ভিসও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে সিজিটিআরআইয়ের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ও সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। জার্ভিসের দায়িত্বের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা নীতি, রাষ্ট্রীয় হুমকি এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয় রয়েছে।

ঘটনাটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি ও অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে। এসব ক্ষেত্রের অনেক গবেষণারই বেসামরিক ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি সামরিক, নজরদারি বা গোয়েন্দা কাজেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। ফলে গবেষণার অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং গবেষণার ফলাফল শেষ পর্যন্ত কার কাজে লাগতে পারে—এ বিষয়গুলো যাচাই করা নিরাপত্তার দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এমআই৫-এর সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অর্থায়নের চূড়ান্ত উৎস নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থাটির লক্ষ্য, সিজিটিআরআইয়ের মাধ্যমে চীনা গোয়েন্দা কাঠামো যেন ব্রিটিশ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা থেকে আর সুবিধা নিতে না পারে।

চীনের প্রতিক্রিয়া

চীনা পক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। লন্ডনে চীনা দূতাবাস ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক বিনিময় আইন ও বিধিবিধান মেনেই পরিচালিত হয়ে আসছে।

ফলে বিষয়টি এখন দুই দেশের মধ্যে বৈধ একাডেমিক সহযোগিতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যকার ভারসাম্যের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। এমআই৫-এর সতর্কবার্তায় আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতাকে সরাসরি অবৈধ বলা হয়নি; বরং গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকা অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরিচয় সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের জন্যও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও গোপন যোগাযোগের মতো প্রযুক্তি এখন কেবল গবেষণাগার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নয়। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং জাতীয় নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় গবেষণার স্বাধীনতা বজায় রেখেও অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।