চীনের বীমা খাতকে আরও স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম করতে বিদ্যমান বীমা আইনে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে বীমা কোম্পানির মূলধন কাঠামো, মালিকানা, সুশাসন, বিনিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন ও কঠোর বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন বীমা আইন সংশোধনের একটি খসড়া প্রকাশ করে। খসড়াটি জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিষয়ে মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত পরিবর্তনের পরিধি বিবেচনায় এটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান বীমা আইনে ১৮৫টি ধারা রয়েছে। সংশোধিত খসড়ায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৪টিতে। অর্থাৎ বিদ্যমান আইনে নতুন করে ২৯টি ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বীমা খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবর্তিত আর্থিক পরিবেশ, নতুন ধরনের ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জটিলতা সামাল দেওয়ার প্রয়োজন থেকেই এই বিস্তৃত সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম নিবন্ধিত মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। বর্তমানে একটি বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যূনতম ২০ কোটি চীনা ইউয়ান মূলধন প্রয়োজন। নতুন প্রস্তাবে এই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি ইউয়ান করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন প্রতিষ্ঠানকে আগের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি মূলধন নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে হবে।
কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় এর মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে। বড় ধরনের দাবি, বাজারের অস্থিরতা কিংবা বিনিয়োগে লোকসানের মতো পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে ক্ষতি সামাল দিতে পারে, সেটিই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উচ্চ মূলধনের বাধ্যবাধকতা বাজারে প্রবেশকারীদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে।
মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে বাড়বে নজরদারি
প্রস্তাবিত আইনে বীমা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারীদের ওপর নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে কার নাম মালিক হিসেবে রয়েছে, তার পাশাপাশি বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিচালনার ক্ষমতা কার হাতে—সেটিও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকদের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
নামমাত্র মালিকানা ব্যবহার করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আড়াল করার প্রবণতা ঠেকাতেও নতুন বিধান যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডাররা যেন নিজেদের স্বার্থে কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় অনুচিত হস্তক্ষেপ করতে না পারেন, সে বিষয়েও কঠোর নিয়মের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূলধন সরবরাহ, করপোরেট সুশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রেও শেয়ারহোল্ডারদের দায়বদ্ধতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। এর ফলে মালিকানার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও পরিচালনাগত ঝুঁকির বিষয়টিও আরও সরাসরি যুক্ত হবে।
বিনিয়োগে বাড়তে পারে সুযোগ
বীমা তহবিলের বিনিয়োগ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশোধিত কাঠামোয় বীমা কোম্পানিগুলোর তহবিল শেয়ার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা পণ্য, স্বর্ণ এবং বিভিন্ন ধরনের ভবিষ্যৎ চুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে।
বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল পরিচালনা করে। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও বৈচিত্র্য আনতে পারবে। তবে একই সঙ্গে এসব বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত বাজারঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও বাড়বে।
খসড়ায় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পরিশোধক্ষমতা, সম্পদ ও দায়ের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো বীমা প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পর সেটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রকদের হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়ানোই এর অন্যতম লক্ষ্য।
সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন কাঠামো
আর্থিক সংকটে পড়া বীমা কোম্পানিগুলোর তদারকি এবং প্রয়োজন হলে সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থাকেও আরও সুসংগঠিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা যাতে অন্য প্রতিষ্ঠান কিংবা বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব না ফেলে।
এ ধরনের কাঠামো কার্যকর হলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের সমস্যা চিহ্নিত করার পর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের হাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বীমা খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর আগাম নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গ্রাহক সুরক্ষায় জোর
আইন সংশোধনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বীমা গ্রাহকদের অধিকার আরও শক্তিশালী করা। বীমা চুক্তির শর্ত স্পষ্ট করা, গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষিত করা এবং বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক আচরণে স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
বীমা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছে চুক্তির শর্ত ও দায়বদ্ধতা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কাঠামোয় এ ধরনের স্বচ্ছতার ওপর নিয়ন্ত্রক গুরুত্ব আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত রয়েছে।
আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও কঠোর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে শুধু বীমা কোম্পানি নয়, সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডার ও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারীদের জন্যও বিধি লঙ্ঘনের আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চীনের বৃহত্তর আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করার চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বীমা আইনের এই সংস্কার সামনে এসেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
জনমত যাচাই শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও সুপারিশ পর্যালোচনা করা হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী খসড়ায় পরিবর্তন এনে আইন প্রণয়নের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া হবে।
সংশোধনগুলো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে চীনের বীমা বাজারে প্রবেশের জন্য মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে নজরদারি কঠোর হবে এবং কোম্পানিগুলোর সুশাসনের ওপর চাপ বাড়বে। একই সময়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে নতুন কাঠামো একদিকে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক শৃঙ্খলা বাড়াবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সুসংগঠিত পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য পূরণ করতে পারে।



