ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিয়ম ভাঙার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফেয়ারস্কয়ার। তবে সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন ঘোষণা করে সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। অলিম্পিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে, বিষয়টি তাদের নৈতিকতা কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে আইওসির এক মুখপাত্র এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
সংস্থা ফেয়ারস্কয়ার তাদের অভিযোগে দাবি করে, ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ধারাবাহিকভাবে আইওসির রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করে চলেছেন। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিভিন্ন সময় তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়টি সংস্থালব্ধ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির মতে, ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ পদে থেকে এমন রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সনদের মূল চেতনার পরিপন্থী।
অভিযোগটি পর্যালোচনার পর আইওসির মুখপাত্র সংবাদমাধ্যম এএফপি-কে জানান যে, তাদের নীতি ও নৈতিকতা কমিশন সমগ্র বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখেছে। কমিশন পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছে, অলিম্পিক চার্টার বা সনদের বিধান অনুযায়ী প্রতিটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশন তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক পরিচালনায় সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করে। ফলে ফিফা সভাপতির রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইওসির নীতি নৈতিকতা কমিশনের কোনো আইনি বা প্রশাসনিক এখতিয়ার থাকে না।
উল্লেখ্য, আইওসির প্রায় একশজন সদস্য দায়িত্ব পালনের সময় শপথপত্রের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন যে, তাঁরা যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। অলিম্পিক চার্টারেও সদস্যদের এই নিরপেক্ষ দায়বদ্ধতার কথা স্পষ্টাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ইনফান্তিনো স্বয়ং আইওসির একজন অন্যতম সদস্য হওয়ায় তাঁর এমন রাজনৈতিক তৎপরতা ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
তবে এটিই প্রথম নয়; গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেও ইনফান্তিনোকে ঘিরে তৈরি হওয়া একই ধরনের আরেকটি বিতর্ক উড়িয়ে দিয়েছিল আইওসি। তৎকালীন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আহ্বান করা ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রথম বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ফিফা সভাপতি। সেখানে তিনি ‘ইউএসএ’ এবং ‘৪৫-৪৭’ লেখা একটি লাল রঙের ক্যাপ পরে উপস্থিত হন, যা স্পষ্টত ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টকালকে নির্দেশ করছিল।
সেই সময়ও আইওসির পক্ষ থেকে সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে জানানো হয় যে, তারা ফিফার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ফিফা ফুটবলের ইতিবাচক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গাজা ও ফিলিস্তিনে ক্রীড়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, শিক্ষা বিস্তার এবং উচ্চতর উন্নয়নমূলক প্রস্তাবে কাজ করছে। আইওসি মনে করে, একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে এ ধরনের সামাজিক বিনিয়োগ কর্মসূচি পুরোপুরি তাদের মূল ভূমিকার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। অলিম্পিক সলিডারিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আইওসি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের খেলাধুলার সার্বিক উন্নয়নে সহায়তা দিয়ে আসছে।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ট্রাম্পের সাথে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে অবশ্য আলোচনা অনেক দিনের। গত ডিসেম্বরে ফিফার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত শান্তি পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। সে সময় ট্রাম্পের হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে ইনফান্তিনো মন্তব্য করেছিলেন, বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সার্বিক ঐক্য তৈরিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মানে তাঁকে ভূষিত করা হয়েছে।
এমনকি উত্তর আমেরিকায় আয়োজিত বিশ্বকাপ চলাকালীন এক চাঞ্চল্যকর দাবি করে বসেছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছিলেন, মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের ওপর চাপানো লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তিনি সরাসরি ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে ফোন করেছিলেন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিফা প্রধানের নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্রীড়া বিশ্বে গুঞ্জন তৈরি হলেও আইওসির সাম্প্রতিক এ পদক্ষেপে তিনি আপাতত সব ধরনের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা থেকে অব্যাহতি পেলেন।



