খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৩:১৪ এএম
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া জুলাই আন্দোলন, বীর শহীদ এবং আহতদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্যের অভিযোগে দেশের বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী ও অভিনয়শিল্পীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ থানায় ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি দেশজুড়ে নতুন করে বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমতের অধিকার নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি তদন্তের জন্য সাইবার ইউনিটে পাঠালেও মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকরা বলছেন, রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের জন্য আইনি হয়রানি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামক একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে মিল্লাত হোসেন গত রবিবার (৫ জুলাই) শাহবাগ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও ও টকশোর বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে:
সাংবাদিক আনিস আলমগীর: কারামুক্তির পর জুলাই আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং আন্দোলনে অঙ্গহানি হওয়া আহতদের নিয়ে উপহাস করার অভিযোগ।
উপস্থাপিকা সোমা ইসলাম: টেলিভিশন টকশোতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে খাটো করে দেখানো এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করার অভিযোগ।
আইনজীবী ও মডেল পিয়া জান্নাতুল: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত জুলাই যোদ্ধাদের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং আন্দোলনকারীদের ‘মব’ বলে তাচ্ছিল্য করার অভিযোগ।
কলামিস্ট মোমিন মেহেদী ও শান্তা ফারজানা: জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ করা এবং শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ।
মডেল মারিয়া কিসপট্টা: জুলাই আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে প্রচার করা এবং আহতদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ।
অভিনেত্রী তুষ্টি: জুলাইকে ‘প্রতারণার মাস’ বলা এবং আন্দোলনে কেউ শহীদ হননি বলে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ।
অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও মাহিয়া মাহি: আন্দোলনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে ‘সাজানো নাটক’ বলা এবং আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার অভিযোগ।
ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তরিকুল ইসলাম এবং শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, অভিযোগটি এখনও নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করা হয়নি। যেহেতু অভিযোগের মূল ভিত্তি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বক্তব্য, তাই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের মাধ্যমে পোস্ট ও ভিডিওগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা হবে। সংশ্লিষ্ট আইডিগুলো প্রকৃত ব্যক্তির কি না, ভিডিওর বক্তব্য এডিট বা বিকৃত করা হয়েছে কি না এবং পুরো বক্তব্যের প্রেক্ষাপট (Context) কী ছিল—তা খতিয়ে দেখার পরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই আইনি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন অভিযুক্ত সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি বিষয়টিকে “চেতনা ব্যবসা” ও সত্য দমনের অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি কখনো শহীদদের অবমাননা করেননি; বরং আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে যারা মব জাস্টিস, চাঁদাবাজি ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তিনি কেবল তাদেরই সমালোচনা করেছেন।
সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল এই বিতর্কের একটি আইনি ও সামাজিক সমাধান সূত্র প্রস্তাব করেছেন। তাঁর মতে, আমাদের ‘রাজনৈতিক মতামত’ এবং ‘ফৌজদারি অপরাধ’-এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বুঝতে হবে:
১. রাজনৈতিক মতামত: কেউ যদি মনে করেন জুলাই আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, তবে তা তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা মতামত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই মত প্রকাশের অধিকার সবার আছে।
২. সহিংসতায় উসকানি: কিন্তু কেউ যদি কাউকে ‘জুলাইবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তার ওপর চড়াও হতে বলেন, ঘরবাড়িতে আগুন দিতে উসকানি দেন বা পুরস্কার ঘোষণা করেন, তবে তা সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জনগণের গভীর আবেগ জড়িয়ে থাকে। ফলে সেই আন্দোলন নিয়ে সমালোচনা অনেক সময় অনেকের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, যারা মন্তব্য করছেন, তাদের যেমন শহীদ ও আহতদের পরিবারের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত, তেমনি কোনো বক্তব্য পছন্দ না হলেই মামলা বা জিডি করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির মনে করেন, ভিন্নমতের জবাব আইনি ব্যবস্থা বা মামলার ভয় দেখিয়ে নয়, বরং তথ্য ও যুক্তিনির্ভর পাল্টা বিতর্কের মাধ্যমে দেওয়া উচিত। একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকরা যদি আইনি প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নিজেদের মত প্রকাশে সেলফ-সেন্সরশিপ (আত্মনিয়ন্ত্রণ) বা ভয়ের সংস্কৃতি বেছে নেন, তবে তা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই দুর্বল করে তুলবে।
মন্তব্য