টাইগারের গাড়িতে গুলি, আহত চালককে হাসপাতালে নিলেন নিজেই

বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় মুম্বাইয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হামলায় অভিনেতার গাড়িচালক ফেরদৌস ও উমেশ চবন নামে আরেক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে তাঁদের দুজনের অবস্থাই শঙ্কামুক্ত বলে পুলিশের সূত্রে জানা গেছে। হামলার সময় টাইগার নিজে গুলিবিদ্ধ না হলেও বারুদ ও ভাঙা কাচের টুকরায় সামান্য আঘাত পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে।

ঘটনার পর আহত চালককে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নিজেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেন টাইগার। তাঁর এই ভূমিকা নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে। এদিকে হামলার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে মুম্বাই পুলিশ। অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে ১৫টি তদন্ত দল কাজ করছে। হামলাকারীদের পালানোর কাজে ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে।

হামলার পেছনে কারা রয়েছে, কেন টাইগারকে লক্ষ্যবস্তু করা হলো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া লরেন্স বিষ্ণোই চক্রের নামে দায় স্বীকারের পোস্টটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। তবে এখন পর্যন্ত হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।

জুহুতে ফুটবল খেলে ফেরার পথে হামলা

পুলিশের সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় ফুটবল খেলে ফেরার সময় হামলার শিকার হন টাইগার শ্রফ। ওই সময় তিনি গাড়িতে বসে ভক্তদের উদ্দেশে হাত নাড়ছিলেন। আশপাশে ভক্তদের ভিড়ও ছিল।

এর মধ্যেই গাড়ির কাছে এসে গুলি চালায় হামলাকারীরা। পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, টাইগারের গাড়ি লক্ষ্য করে পাঁচটি গুলি ছোড়া হয়। এতে গাড়িচালক ফেরদৌস গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থলে থাকা উমেশ চবন নামের আরেক ব্যক্তিও গুলিবিদ্ধ হন। তবে অভিনেতার শরীরে সরাসরি গুলি লাগেনি।

এনডিটিভির প্রকাশিত ভিডিওর বিবরণ অনুযায়ী, হামলায় দুজন সরাসরি গুলি চালান এবং তাঁদের তৃতীয় সহযোগী মোটরসাইকেল নিয়ে পালানোর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। গুলি চালানোর একপর্যায়ে একজনের অস্ত্র আটকে যাওয়ার দৃশ্যও ভিডিওতে দেখা গেছে বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে। এরপর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে ভক্তদের উচ্ছ্বাস ছিল, গুলির শব্দে সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হামলার আকস্মিকতায় আশপাশের লোকজনও হতভম্ব হয়ে যান।

আহত চালককে নিয়ে নিজেই হাসপাতালে টাইগার

হামলার পরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, টাইগার গাড়ির চালকের আসনে গিয়ে বসছেন। *টাইমস অব ইন্ডিয়া*র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় এক নারীকে তাঁকে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করতে শোনা যায়।

গুলিবিদ্ধ চালককে গাড়িতে নিয়ে টাইগার নিজেই মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে যান। চালকের বাঁ হাতে গুলি লেগেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা হামলার পরপরই সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কাড়ে।

মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে পরে জানান, টাইগারের শরীরে গুলি না লাগলেও বারুদ ও ভাঙা কাচের টুকরায় সামান্য আঘাত পেয়েছেন তিনি। এ কারণে অভিনেতার হাতে ব্যান্ডেজ ও শরীরের কয়েকটি স্থানে ড্রেসিং দেখা গেছে বলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রকাশিত ছবিতে বোঝা যায়।

টাইগারের বাবা জ্যাকি শ্রফের টিম ভারতীয় সংবাদমাধ্যম *ইন্ডিয়া টুডে*কে জানিয়েছে, অভিনেতা ভালো আছেন। তাঁর মা আয়েশা শ্রফও ছেলের শারীরিক অবস্থা নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্ধেরির কাছে ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল জব্দ

হামলার পর তদন্তে নেমে মুম্বাই পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চ বিভিন্ন সূত্র ধরে এগোচ্ছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, আন্ধেরি রেলস্টেশনের কাছে একটি মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। পরে সেটি জব্দ করে পুলিশ।

এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট ও চেসিস নম্বর পরীক্ষা করে মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের গতিবিধি, পরিচয় এবং পালানোর পথ শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আহত গাড়িচালক ফেরদৌসের বক্তব্যও নিয়েছেন তদন্তকারীরা।

ঘটনায় হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্র আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন, গুলির উৎস এবং হামলাকারীরা আগে থেকে অভিনেতার গতিবিধি সম্পর্কে জানতেন কি না, সেসব বিষয় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনজনের একটি দল পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হামলার উদ্দেশ্য কিংবা অভিযুক্তদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

বিষ্ণোই চক্রের নামে দায় স্বীকারের পোস্ট

হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লরেন্স বিষ্ণোই চক্রের নামে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অনিল পণ্ডিত ও হারমান সান্ধুর নাম উল্লেখ করে হামলার দায় স্বীকারের দাবি করা হয়েছে। পোস্টে আরও বলা হয়, টাইগারকে আগে ফোন করে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করায় তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে পোস্টে দাবি করা হয়।

টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, অনিল পণ্ডিতের নামে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তায় সালমান খানকে লরেন্স বিষ্ণোই ও বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট ও অডিও বার্তার সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। মুম্বাই পুলিশও টাইগারের গাড়িতে হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের যোগসূত্র নিশ্চিত করেনি। ফলে অনলাইনে প্রচারিত দাবিকে এখনই হামলার পেছনের প্রকৃত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সালমান খানের সঙ্গে বিরোধের পুরোনো প্রেক্ষাপট

লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে সালমান খানের বিরোধের পেছনে রয়েছে ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের ঘটনা। রাজস্থানে হাম সাথ সাথ হ্যায় ছবির শুটিং চলাকালে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার অভিযোগ ওঠে সালমানের বিরুদ্ধে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ বিশেষভাবে শ্রদ্ধার বলে বিবেচিত।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সালমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালেও অভিনেতাকে হত্যার হুমকির খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টসের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালান। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। ওই হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের যোগসূত্র থাকার কথা পুলিশ জানিয়েছিল। একই বছরের অক্টোবরে সালমানের ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকিকে মুম্বাইয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের পরও বিষ্ণোই চক্রের সদস্য পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি দায় স্বীকার করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

পুরোনো এসব ঘটনার কারণে টাইগারের গাড়িতে হামলার পর বিষ্ণোই চক্রের নাম সামনে আসায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু আগের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান হামলার যোগসূত্র রয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

টাইগারের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস সরকারের

ঘটনার পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশ ফোনে টাইগার শ্রফের সঙ্গে কথা বলেন। হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

রোববার রাতে টাইগারের বাড়িতে গিয়ে অভিনেতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে। সে সময় টাইগারের মা আয়েশা শ্রফও উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাতের পর শিন্ডে জানান, গুলি না লাগলেও বারুদ ও কাচের টুকরায় টাইগার সামান্য আহত হয়েছেন। হামলার ঘটনায় অভিনেতা ও তাঁর মা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পরিবারকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে শিন্ডে বলেন, মুম্বাইয়ে হুমকি বা সহিংসতার মাধ্যমে কাউকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না। এ ধরনের হুমকি সরকার সহ্য করবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

ঘটনার পর এখন পুলিশের সামনে প্রধান কাজ হামলাকারীদের শনাক্ত করা, তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা এবং হামলার পেছনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের নামে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট ও অডিও বার্তার সত্যতা যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় তদন্ত চলছে। হামলার সঙ্গে কোনো সংগঠিত অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য পুলিশি তদন্ত ও প্রমাণের অপেক্ষা করতে হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।