মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা বর্তমানে মহামারির রূপ ধারণ করেছে। স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এই প্রাদুর্ভাবে ৩২ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫০ জনেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই বয়স ৫ বছরের নিচে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তন এবং এর ফলে সৃষ্ট সরবরাহ সংকটকে দায়ী করছেন।
নীতিগত পরিবর্তন ও টিকার তীব্র সংকট
বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিকভাবে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গাভি)-এর সহায়তায় দেশে নিয়মিত হাম-রুবেলার (MR) টিকা দেওয়া হতো। তবে ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘদিনের ইউনিসেফ-নির্ভর প্রক্রিয়া বন্ধ করে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতিতে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে টিকার বৈশ্বিক বাজারে ইউনিসেফের বিশেষ সুবিধা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয় এবং নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দেয়। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ারস জানান, তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই পদক্ষেপের পরিণাম সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছিলেন। ইউনিসেফের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত করে দেশে টিকার সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
হাসপাতালের চিত্র ও মানবিক বিপর্যয়
হামের এই প্রাদুর্ভাব রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে এক বিশৃঙ্খল ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী আসায় অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক মর্মান্তিক দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। ওইদিন কণিকা আক্তার নামের এক মায়ের ছয় মাস বয়সী যমজ কন্যা ‘রিসা’ হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে তাঁর আরেক কন্যা ‘রুহি’ একই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। এমন অসংখ্য পরিবারের আহাজারিতে হাসপাতালগুলোর পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে।
ভৌগোলিক বিস্তার ও পুষ্টির অভাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রথম এই প্রাদুর্ভাবের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IEDCR) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, ২০২৪ সাল থেকে দেশে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। হামের জটিলতা রুখতে ভিটামিন-এ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন-এ এর তীব্র ঘাটতি এবং শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি এই প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা
এই স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও আইনি সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা, অবহেলা এবং দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান ‘সায়েন্স’ সাময়িকীকে জানান, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তারা প্রচলিত নিয়মে উন্মুক্ত দরপত্রের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে টিকার জীবনদায়ী প্রয়োজনীয়তা এবং জরুরি পরিস্থিতির গুরুত্ব কেন বিবেচনা করা হয়নি, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি ও গৃহীত পদক্ষেপ
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকার এই বিপর্যয় মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, সরকার পূর্বের বিতর্কিত নীতি পরিবর্তন করে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনা শুরু করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, সংক্রমণের গতি যে হারে বাড়ছে তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সময়সাপেক্ষ। তিনি এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে অনতিবিলম্বে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের বিগত কয়েক দশকের টিকাদান সাফল্যের ওপর বড় ধরনের চপেটাঘাত। টিকার মজুত নিশ্চিত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।



