খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৪:২০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জর্ডানের আকাশসীমা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। জর্ডানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেট্রার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে। হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্রের বরাত দিয়ে পেট্রা জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু কী ছিল, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জর্ডানের কোন এলাকায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল কিংবা সেগুলোর ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এই হামলার সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলার জবাবে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তার সেই বক্তব্যের পরপরই জর্ডানের দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল, তারা টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনীর হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনার ঘাঁটি এবং উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো। এসব হামলার পর ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
জর্ডানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা শুধু দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতির প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। জর্ডান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত এবং দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ফলে সেখানে কোনো হামলা হলে তা সরাসরি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ইরানের ভেতরেও হামলা ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। কেশম দ্বীপটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব বিস্ফোরণের প্রকৃতি, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হামলার সঙ্গে এর সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
এর আগে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই হামলার পর পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা সেই উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা একই সময়ে সমুদ্রপথেও ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলায় দুটি প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজে আগুন লাগার খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রে। হামলার শিকার জাহাজ দুটির মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ জাহাজ এবং গ্রিসের মালিকানাধীন একটি ট্যাংকার। ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
দামিয়েত্তা বন্দরের হামলার দায় এখনো কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি। ফলে এর পেছনে কারা রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে জর্ডান, ইরাক, ইরান এবং মিসরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে একের পর এক নিরাপত্তা সংকট দেখা দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পরিধি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, ইরানের পাল্টা হামলা এবং বিভিন্ন দেশে সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় আক্রমণের ঘটনায় উত্তেজনা এখন একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
মন্তব্য