খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ক্যাম্পাসে নতুন উপাচার্যের যোগদানকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির–সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আজ রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে পুরো ক্যাম্পাস এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কয়েক দফা কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। এই সহিংসতায় গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ৫ পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই নিয়োগের পরপরই ডুয়েটের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার একাডেমিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা অন্যান্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ভিন্ন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত।
এই দাবিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং ঢাকা–শিমুলতলী সড়কে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান। গত শুক্রবারও বিভিন্ন বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এই আন্দোলন অব্যাহত থাকে। আন্দোলনকারীরা নতুন উপাচার্যকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ব্যানার টানিয়ে দেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় আজ সকালে ‘নতুন ভিসিকে লাল কার্ড’ কর্মসূচির ডাক দেন। সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে একপর্যায়ে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেন।
সকাল ১০টার দিকে নতুন উপাচার্য মোহাম্মদ ইকবাল ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর আগেই প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁকে স্বাগত জানাতে ছাত্রদল–সমর্থিত শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ ফটক খুলে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তা ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের একটি অংশ বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। জবাবে বাইরে অবস্থান নেওয়া পক্ষটিও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় প্রধান ফটকের সামনে আগুন জ্বালানো হয় এবং বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে এই ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক দফা কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। নিচে হতাহত ও আইনশৃঙ্খলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেওয়া হলো:
| বিবরণ | তথ্য ও সংখ্যা |
| মোট আহতের সংখ্যা | অন্তত ২০ জন |
| আহত পুলিশ সদস্য | ওসি আমিনুল ইসলামসহ মোট ৫ জন |
| আহত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য | উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন |
| চিকিৎসাস্থল | শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুর |
| আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ | কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন |
| বর্তমান পরিস্থিতি | এলাকা শান্ত, তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত উত্তেজনা বিরাজমান |
এই সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পরস্পরের বিরুদ্ধে লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উত্থাপন করেছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বক্তব্য: সংগঠনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে ছাত্রশিবির–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিকল্পিতভাবে ডুয়েট ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিদায়ী প্রশাসনের কিছু অংশ ও ছাত্রশিবির নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একযোগে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করছে। ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের বক্তব্য: অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ এক বিবৃতিতে পাল্টা দাবি করেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল, যুবদল ও বহিরাগত ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপিপন্থী শিক্ষক এবং কর্মকর্তা–কর্মচারীরাও দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলায় অংশ নেন।
ক্যাম্পাসে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল তাঁর দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। ডুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবু তৈয়ব জানান, সংঘর্ষের সময় নতুন উপাচার্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন। পরবর্তীতে বিকেলে সাবেক উপাচার্য জয়নাল আবেদীনের কাছ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ছাত্রশিবির–সমর্থিত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গেটের ভেতরে অবস্থান নিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে এই সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ক্যাম্পাস এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।