ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা: এক অমর প্রেরণার নাম

শহীদ জোহা—শুধু একটি নাম নয়, একটি চেতনা। একজন শিক্ষক, যিনি পাঠ্যবইয়ের সীমা পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন সাহস, দায়বদ্ধতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
আমি তাঁকে সরাসরি দেখিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ১৪ বছর আগেই তিনি শহীদ হয়েছেন। তবুও প্রতিদিন প্রশাসনিক ভবনের সামনে তাঁর সমাধির দিকে তাকালে মনে হয়েছে—একজন শিক্ষক এখনও ক্যাম্পাসকে আগলে আছেন। তাঁর নীরব উপস্থিতি যেন বলেছে, “ন্যায়ের পথে দাঁড়াতে ভয় পেও না।”
রক্তে রঞ্জিত শার্ট, ইতিহাসের দীপ্ত উচ্চারণ
১৯৬৯ সালের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলো। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যুর খবর সারা দেশে আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলের প্রস্তুতি নেয়।
তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা বুঝতে পারলেন—মিছিল বের হলে প্রাণহানির আশঙ্কা প্রবল। তিনি ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বাজি রাখলেন। মূল ফটকে গিয়ে সেনাদের সামনে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন:
“দয়া করে গুলি ছুঁড়বেন না, আমার ছাত্ররা এখনই ফিরে যাবে।”
কিন্তু নিষ্ঠুর গুলি থামেনি। ছাত্রদের রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে গুলিবিদ্ধ হন তিনিই।
এর আগের দিন, ১৭ ফেব্রুয়ারি, কলাভবনে শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত নিজের শার্ট দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন—
“আজ আমি ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত। এরপর কোনো গুলি হলে তা ছাত্রকে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে।”
এই উচ্চারণ কোনো আবেগের মুহূর্ত ছিল না—ছিল আত্মোৎসর্গের অঙ্গীকার।
অবহেলায় মৃত্যুর পথে
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে সেনাবাহিনীর ভ্যানে করে নেওয়া হয় মিউনিসিপ্যাল অফিসে। সেখানে চিকিৎসা না দিয়ে দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা হয়। পরে রাজশাহী মেডিকেলে নেওয়া হলেও বিকেল ৪টার দিকে অপারেশন থিয়েটারে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এক উদাহরণ—ছাত্রদের প্রাণ বাঁচাতে জীবন উৎসর্গকারী শিক্ষক।
স্মৃতিতে অমর এক শিক্ষক
তাঁকে সমাহিত করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রশাসনিক ভবনের সামনে—আজকের ‘জোহা চত্বর’।

Untitled 2026 02 18T090930.662 ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা: এক অমর প্রেরণার নাম

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের নাম রাখা হয়েছে ‘শহীদ শামসুজ্জোহা হল’।
২০০৮ সালে তিনি মরণোত্তরভাবে ভূষিত হন স্বাধীনতা পদক-এ—যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান।
জীবন ও শিক্ষা
১৯৩৪ সালের ১ মে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন ড. জোহা।
১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে লন্ডনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৪ সালে দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।
প্রজ্ঞা, শৃঙ্খলা ও মানবিক নেতৃত্বের গুণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হন—আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন।
শিক্ষক দিবসের দাবি
১৮ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শিক্ষক দিবস’ ঘোষণার দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। কারণ এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়—শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, প্রয়োজনে জীবন দিয়েও ছাত্রদের রক্ষা করেন।

Untitled 2026 02 18T091005.165 ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা: এক অমর প্রেরণার নাম
আমার আদর্শ, আমার প্রেরণা
আমি তাঁকে চোখে দেখিনি। কিন্তু তাঁর সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে বারবার অনুভব করেছি—একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই মহান হয়, যখন তার শিক্ষক ছাত্রদের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকেন।
তাঁর সেই সাহস আমাকে শিখিয়েছে—স্বৈরাচার, অন্যায় ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়।
তাই বলি, চোখের দেখা না দেখেও শহীদ জোহা স্যার আমার আদর্শিক শিক্ষক।
তিনি আমার সাহসের উৎস, নৈতিক শক্তির বাতিঘর।
শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও অমলিন ভালোবাসায়—
শহীদ ড. শামসুজ্জোহা চিরঞ্জীব।

লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক ” খবরওয়ালা ও জি লাইভ ২৪”

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।