খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জুন ২০২৬, ১:২৪ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রেরণের নাম করে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সংরক্ষিত গোডাউন থেকে কোটি টাকা মূল্যের উচ্চ শুল্কের ভারতীয় পণ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগে বেনাপোল বন্দর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কর্তৃক পণ্যবোঝাই একটি কাভার্ডভ্যান জব্দের পর এই ঘটনার সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ২ জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) এবং ৩ জন সিপাহীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কাস্টমস ও বিজিবি সূত্র থেকে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধারকৃত এবং বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে জব্দ করা উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য কাস্টমসের সংরক্ষিত গোডাউনে জমা রাখা ছিল। সরকারি নিয়মানুযায়ী এই পণ্যসমূহ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রেরণের আইনি প্রক্রিয়া চলছিল। অভিযোগ উঠেছে, এই বিশেষ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ত্রাণ তহবিলের সাধারণ পণ্যের আড়ালে কাস্টমস গোডাউন থেকে উচ্চ শুল্কযুক্ত বাণিজ্যিক মালামাল বের করে বাইরে পাচারের অপচেষ্টা চালায়।
সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বেনাপোল বাজার এলাকায় যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের বেনাপোল বিজিবি কোম্পানির সদস্যরা একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে ঢাকা মেট্রো-ট ২৪-৫৬২১ নম্বরের একটি সন্দেহভাজন কাভার্ডভ্যান আটক করা হয়। গাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য উদ্ধার করা হয়।
অভিযানকালে ঘটনাস্থল থেকে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শ্রী ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী (৩৮), কাভার্ডভ্যান চালক মো. মহসিন আলী (৩৪) এবং হেলপার মো. জাহিদ হাসান (২১)-কে আটক করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, উদ্ধারকৃত চালানের মধ্যে উচ্চ শুল্কের ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কসমেটিকস এবং আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় ওষধ রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
এই ঘটনার পর বেনাপোল বন্দরের সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এজেন্টদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক লতা জানান, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মতো রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের নাম ব্যবহার করে পণ্য পাচার করা একটি গুরুতর অপরাধ। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি না দিলে বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অপর এক ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোলে পণ্য চুরি, শুল্ক ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ত্রাণ তহবিলের আড়ালে এই পাচারের চেষ্টা মূলত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের অংশ।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। নতুন এই ঘটনাটি বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকে পুনরায় সামনে এনেছে। নিচে বেনাপোল বন্দরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা প্রধান প্রধান অনিয়ম ও বর্তমান ঘটনার একটি বিবরণী টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | ঘটনার বিবরণ ও অবস্থান | পণ্যের বিবরণ ও আনুমানিক মূল্য | বর্তমান আইনি ও প্রশাসনিক অবস্থা |
| ০১ | ত্রাণ তহবিলের আড়ালে পাচার চেষ্টা (বেনাপোল বাজার) | ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস ও নিষিদ্ধ ওষুধ; মূল্য প্রায় ১.১৫ কোটি টাকা। | ২ এআরও ও ৩ সিপাহী সাময়িক বরখাস্ত; কাস্টমস কর্মকর্তা ও চালকসহ ৩ জন আটক। |
| ০২ | ৩৭ নম্বর শেড থেকে পণ্য উধাও | কাস্টমসের জব্দকৃত ভারতীয় মালামাল; মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। | কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মামলা দায়ের এবং তদন্ত চলমান। |
| ০৩ | ৪১ নম্বর শেড থেকে পণ্য নিখোঁজ | আমদানিকৃত বাণিজ্যিক মালামাল; পরিমাণ প্রায় ২৫ টন। | নিখোঁজের সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। |
| ০৪ | ২৬ নম্বর শেড থেকে পণ্য জব্দ | ঘোষণাবহির্ভূত ভারতীয় শাড়ি ও কসমেটিকস; মূল্য প্রায় ১.৫ কোটি টাকা। | মালামাল বাজেয়াপ্তকরণ ও বিভাগীয় আইনি প্রক্রিয়া চলমান। |
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান জানিয়েছেন, জব্দকৃত পণ্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও চূড়ান্ত সিজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে এবং আটককৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান এই বিষয়ে কাস্টমসের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একটি উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কাস্টমস হাউস জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে।
মন্তব্য