খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ৪:২০ পিএম
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় নবনির্মিত মডেল মসজিদে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের একটি গোপন কর্মশালা ও প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ মসজিদের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিলে ভেতরে থাকা কয়েকশ নারী কর্মী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। পরে খবর পেয়ে দামুড়হুদা মডেল থানা পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আজ শনিবার (১১ জুলাই) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দামুড়হুদা উপজেলা সদরের মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণে এই তুলকালাম কাণ্ড ঘটে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ১০টার পর থেকেই চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ইজিবাইক, সাধারণ যান ও মাইক্রোবাসযোগে দলে দলে বোরকা পরিহিত নারীরা দামুড়হুদা মডেল মসজিদে আসতে শুরু করেন। তারা সরাসরি মসজিদের একটি অংশে অবস্থান নেন। দুপুরে স্থানীয় সাধারণ মুসল্লিরা যখন জোহরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান, তখন তারা ভেতরে বিশাল রাজনৈতিক ধাঁচের নারী সমাগম লক্ষ্য করেন।
মুহূর্তের মধ্যেই খবরটি পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে যে, সরকারি এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নারী উইং একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে। এই খবর পেয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীসহ বাজার এলাকার শত শত সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা মসজিদের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং একপর্যায়ে মসজিদের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। এই সময় ভেতরে থাকা জামায়াত কর্মীদের সাথে বাইরে থাকা উত্তেজিত জনতার তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
একটি রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কীভাবে এমন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হলো, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মসজিদের কেয়ারটেকার মো. শাহজাহান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগতভাবে এই কর্মসূচির জন্য মসজিদ প্রাঙ্গণ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন।
এই বিষয়ে কেয়ারটেকার মো. শাহজাহান নিজের দায় স্বীকার করে জানান, জামায়াতের স্থানীয় মহিলা কর্মীরা নারীদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধারণ প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে একদিনের জন্য ৩ হাজার টাকায় মসজিদের জায়গাটি ভাড়া নিয়েছিল। তিনি স্বীকার করেন যে, এই স্পর্শকাতর বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা সভাপতিকে জানাননি।
অন্যদিকে, দামুড়হুদা উপজেলা জামায়াত ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মো. আবেদ উদ্ দৌলা রিটন এই কর্মসূচির সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, শনিবার আগে থেকেই নির্ধারিত তাদের মহিলা জামায়াতের একটি নিয়মিত দিনব্যাপী সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।
এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল হাসান তনু অভিযোগ করেন, “মডেল মসজিদে প্রায় ৩ থেকে ৪ শ জামায়াত কর্মী অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। সরকারি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এমন গোপন তৎপরতার খবর পেয়ে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ধাওয়া দেয়। এই সময় দুপক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ এসে তাদের বের করে নিয়ে যায়।”
দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. মেজবাহ উদ্দিন জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো প্রোগ্রামের ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানা ছিল না। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ গিয়ে অবরুদ্ধ নারীদের উদ্ধার করে এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়।
পুরো ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং মডেল মসজিদ কমিটির সভাপতি লাভলী ইয়াসমিন। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, “যেহেতু আমি এই মডেল মসজিদের সভাপতি, সেহেতু এত বড় একটা আয়োজন বা নারীদের সমাগমের বিষয়ে আমাকে কেন জানানো হলো না? কেন আমার কোনো পূর্বানুমতি নেওয়া প্রয়োজন মনে করা হয়নি? এই ধৃষ্টতার জন্য মসজিদের কেয়ারটেকারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী কার্যদিবসের মধ্যে তাকে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।” বর্তমানে মসজিদের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
মন্তব্য