দিল্লিতে মেসবাড়ি ধসে শিক্ষার্থী মৃত্যু, মোদিকে সিজেপির নিশানা

ভারতের রাজধানী দিল্লির সত্য নিকেতনে শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত একটি ছয়তলা মেসবাড়ি ধসে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নেতা অভিজিৎ দিপকে অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আবাসন অবকাঠামোর দিকে যথেষ্ট নজর না দিয়েই সরকার রাজনৈতিক বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

রোববার দিল্লির চাণক্যপুরী এলাকার সত্য নিকেতনে ওই ছয়তলা ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে। ভবনটি শিক্ষার্থীদের ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসেবে থাকার জন্য ব্যবহৃত হতো। ধসের পর উদ্ধারকাজ চালিয়ে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। তাঁদের গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবারও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, সে বিষয়ে তখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যবস্থা ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানী দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে শিক্ষার্থীদের বসবাসের জন্য ব্যবহৃত ভবনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঘটনার পরদিন ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তরুণদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, অথচ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামোর ঘাটতি ও সরকারি অবহেলার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

অভিজিৎ প্রশ্ন তোলেন, সরকারি অবহেলা ও দুর্বল অবকাঠামোর মূল্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের আর কত প্রাণ দিতে হবে। তাঁর বক্তব্যে আদিবাসী এলাকাগুলোর শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম পরিষেবার অভাবের কথাও উঠে আসে। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীরা খুব বেশি কিছু চান না; তাঁরা চান নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ আবাসন এবং ন্যূনতম সম্মান। দিল্লিতেও যদি শিক্ষার্থীরা মেসবাড়ি ধসে প্রাণ হারান, তাহলে রাজধানীর শিক্ষার্থী আবাসনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অভিজিৎ আরও বলেন, তিনি যেন আবার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা করেন—শিক্ষার্থীদের বসবাসের এমন একটি ভবন কীভাবে ধসে পড়ল এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে সরকারের কী ব্যবস্থা রয়েছে।

এই সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শ্রীরাম কলেজ অব কমার্সের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় মোদি তরুণদের মধ্যে ‘দিমাগি নকশাল’ ধারণা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, লাল কেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে তিনি সংক্ষেপে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন এবং এর পরেই এ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। তিনি বিষয়টিকে হোমিওপ্যাথি ওষুধের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, শুরুতে প্রতিক্রিয়া বাড়লেও পরে তা কমে আসে।

প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সিজেপির নেতারা আগে থেকেই সমালোচনা করে আসছিলেন। অভিজিৎ দিপকের অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা না করে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তরুণেরা যখন শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর দুরবস্থা ও কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলছেন, তখন তাঁদের উদ্দেশে নানা ধরনের রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে মেসবাড়ি ধসের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গোয়ায় ছিলেন। সেখানে তিনি একটি দলীয় কার্যালয় ভবন উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তাঁর অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনাকেও রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ করেছেন অভিজিৎ। তাঁর প্রশ্ন, বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক দলের বড় বড় কার্যালয় নির্মাণ হলেও শিক্ষার্থীদের কেন অনিরাপদ ভবনে বসবাস করতে হবে। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সিজেপি এর আগেও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে পিএম কেয়ার্স তহবিলের অর্থ ব্যবহারের দাবি জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তহবিলে অব্যবহৃত অর্থ থাকলে তা দিয়ে বিভিন্ন রাজ্য ও জেলায় উন্নতমানের সরকারি স্কুল ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে।

দলটির নেতারা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি স্কুল ভবনের অবস্থা পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও তাঁদের বাধা দেওয়া এবং মারধরের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ সালের হিসাবে পিএম কেয়ার্স তহবিলে ৮ হাজার ৪৫২ কোটি রুপি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিজিৎ দিপকের দাবি, এই অর্থ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

তবে সত্য নিকেতনের মেসবাড়ি ধসের ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং ভবনটির নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত। ধসের আগে ভবনটির অবস্থা কেমন ছিল, সেটি আবাসিক ব্যবহারের উপযোগী ছিল কি না এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো নিয়ম ভঙ্গ হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।

ছয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং আরও কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আবাসন শুধু থাকার জায়গার বিষয় নয়; এটি তাঁদের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। দিল্লির এই দুর্ঘটনার পর মেস, পেইং গেস্ট ও হোস্টেল ভবনের নিরাপত্তা যাচাইয়ের দাবি সামনে আসায় বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জননিরাপত্তার আলোচনাতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

Tags :

মুরসালিন মাহমুদ তাইসিন | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।