খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
দেশের অর্থনীতি রক্তক্ষরণে ভুগছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যবসায়ীরা বারবার বললেও সরকার তা শুনছে না এবং তাদের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে না। বনানীর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার আয়োজিত মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এখন যারা ঋণ নিচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য মূলত আগের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা, যাতে ঋণগুলো অনিয়মিত বা খেলাপি না হয়। বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি অভিযোগ করেন, অর্থনীতির রক্তক্ষরণ স্পষ্ট; কিন্তু সরকার তাতে কোনো মনোযোগ দিচ্ছে না।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
আনোয়ার উল আলম বলেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করেও সরকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। ২০২২ সাল থেকে জ্বালানির ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই ঢাকায় এসে অটোরিকশা চালাচ্ছেন, ফলে রাজধানীর জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছেছে।
খেলাপি ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ থাকাকালে আইএমএফ বাংলাদেশকে মধ্যম মানের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। বর্তমানে খেলাপি ঋণ ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তার প্রশ্ন, এখন আইএমএফ এ পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে। আগে ঋণ পুনঃতপশিল করতে ছয় মাস সময় থাকলেও এখন তা কমিয়ে তিন মাস করা হয়েছে, যা তার মতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়িয়ে দেবে।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, মে মাস থেকে রিয়েল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট (আরইইআর) সূচক বেড়েছে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংক আর ডলার কিনে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারছে না। ফলে আমদানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, যা রপ্তানিকারকদেরও সহায়তা করবে। সক্রিয় আমদানি প্রবাহ নমনীয় বিনিময় হার বজায় রাখতে এবং রপ্তানি পরিবেশকে উন্নত করতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক গতি কমলেও স্থিতিশীলতা এসেছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে আরও উদার নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্কের কারণে রপ্তানি কিছুটা কমলেও বাংলাদেশ এখনো ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে।
মূল প্রবন্ধে অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, কঠোর পদক্ষেপ না নিলে উচ্চ খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতিতে মধ্যমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অগ্রগতির সম্ভাবনা সংকুচিত হতে পারে। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আধুনিক সময়ের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি রয়েছে দেশের অর্থনীতি। অধিকাংশ খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর জামানত না থাকায় বাস্তব মূল্যায়ন কঠিন হয়ে যাচ্ছে এবং এতে সমাধান প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি জানান, আর্থিক খাতে প্রায় ৬.৪ লাখ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করছে। বিপুল খারাপ ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয় এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। এতে তৈরি হয় এক ধরনের ‘বিষাক্ত চক্র’—বিনিয়োগ কমে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে, প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়। সঠিকভাবে এই সংকট মোকাবিলা করা না গেলে দেশ ‘উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন বিনিয়োগ, নিম্ন প্রবৃদ্ধি’ পরিস্থিতিতে আটকে পড়তে পারে। এটি শুধু ব্যাংক খাতের সমস্যা নয়, পুরো সামষ্টিক অর্থনীতির বাধা।
গবেষণা সংস্থা পিআরআই জানায়, পুনর্গঠিত, পুনঃতপশিলকৃত ও খেলাপি ঋণসহ ব্যাংকিং খাতে মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।
সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এ কে এম আতিউর রহমান, বিল্ড-এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. ওয়াসেল বিন সাদাত এবং পিকার্ড বাংলাদেশের ডিএমডি আমৃতা মাকিন ইসলাম।
ড. ওয়াসেল বলেন, সত্ করদাতারা শাস্তির মুখে পড়ছেন, যা করনীতির ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। ফলে অর্থনীতির প্রায় ৮৫ শতাংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারেও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির যথেষ্ট প্রতিফলন নেই।
ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, করনীতি প্রণয়ন করা উচিত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের মাধ্যমে, আমলাদের মাধ্যমে নয়। কর্মসংস্থান ঘাটতি এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব পরবর্তী সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ড. আতিউর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন না হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যেত।
খবরওয়ালা/টিএসএন