খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি এবং সংসদীয় ঐতিহ্য মেনে সংসদ সদস্যরা এখন থেকে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকার বা সভাপতির আসনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদের বৈঠকের শুরুতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে সংসদ কক্ষে প্রবেশ, প্রস্থান এবং আসন গ্রহণ বা ত্যাগের সময় সভাপতিকে সম্মান জানানোর দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতির একটি আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো।
সংসদ কক্ষে প্রবেশের সময় হাউস এবং সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য অতীতে মাথা ঝুঁকিয়ে (বো করে) সম্মান প্রদর্শনের একটি বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, পূর্বে কার্যপ্রণালি বিধিতে ‘ঝুঁকিয়া’ সম্মান প্রদর্শনের বিধান স্পষ্ট আকারে থাকলেও ২০০৬ সালে তা সংশোধন করা হয়।
২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন পেশ করে। পরবর্তীতে একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর উক্ত প্রতিবেদনটি সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যপ্রণালি বিধির মূল পাঠ্য থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
আজ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ (১) উপ-বিধিটি উদ্ধৃত করে বর্তমান আইনি অবস্থান স্পষ্ট করেন। উক্ত বিধিতে বলা হয়েছে:
“সংসদের বৈঠক চলাকালে কোনো সদস্য সংসদে প্রবেশ করার বা সংসদ–কক্ষ ত্যাগ করার সময় এবং তাঁহার আসন গ্রহণ বা ত্যাগ করার সময়ে সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিবেন।”
যেহেতু ২০০৬ সালের সংশোধনীর পর থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটির আইনগত অস্তিত্ব নেই, তাই স্পিকার উপস্থিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, “যেহেতু ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে, মাননীয় সদস্যবৃন্দ, আপনারা যার যার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকারের চেয়ারের প্রতি বা সভাপতির প্রতি সম্মান জানাবেন।”
সংসদ কক্ষে সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এই পদ্ধতিগত বিষয়টি নিয়ে বিগত কয়েকটি কার্যদিবসে সংসদ সদস্যদের মধ্যে আলোচনা ও আপত্তির সৃষ্টি হয়। গত ১৬ জুন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান সংসদ কক্ষে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শনের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি উত্থাপন করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, এটি এক সময় কার্যপ্রণালি বিধিতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সংশোধনী এনে তা অনেক আগেই বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন যে, সংসদীয় আইন ও নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি পরবর্তীতে এই বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।
এরই ধারাবাহিকতায়, গতকাল বুধবার সংসদের প্রবীণ সদস্য ও বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকও কার্যপ্রণালির এই অমীমাংসিত বিষয়টি দ্রুত সুরাহা করার জন্য স্পিকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান। দুই দলের সংসদ সদস্যদের এই দাবি ও পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করেই আজ স্পিকার এই চূড়ান্ত নির্দেশনামূলক সিদ্ধান্ত জারি করেন।
স্পিকারের সিদ্ধান্ত এবং কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ (১) নং বিধির ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও প্রেক্ষাপট নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | সময়কাল ও তারিখ | সংসদীয় ঘটনা ও প্রেক্ষাপট | বিধির আইনি রূপ ও অবস্থা |
| ১. | ২০০৬ সালের পূর্বে | সাধারণ সংসদীয় কার্যকাল | কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী স্পিকারের প্রতি ‘ঝুঁকিয়া’ সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম বলবৎ ছিল। |
| ২. | ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৬ | অষ্টম জাতীয় সংসদ | কার্যপ্রণালি বিধি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিধি সংশোধনের প্রতিবেদন জমা দেয়। |
| ৩. | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৬ | সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ | জাতীয় সংসদে প্রতিবেদনটি গৃহীত হয় এবং বিধি থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। |
| ৪. | ১৬ জুন ২০২৬ | জামায়াত এমপির আপত্তি | সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে মাথা ঝুঁকানোর বিষয়ে আপত্তি তোলেন। |
| ৫. | ১৭ জুন ২০২৬ | বিএনপি এমপির অনুরোধ | সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বিষয়টি দ্রুত সুরাহার জন্য স্পিকারকে অনুরোধ করেন। |
| ৬. | ১৮ জুন ২০২৬ | স্পিকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত | কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ (১) ধারা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে সম্মান জানানোর নির্দেশ। |
জাতীয় সংসদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা কক্ষে প্রবেশ বা ত্যাগের সময় সভাপতিকে সম্মান জানাতে অনেকে মাথা ঝোঁকাতেন, আবার অনেকে দাঁড়িয়ে মৌখিক সালাম বা অভিবাদন জানাতেন। স্পিকারের আজকের এই রুলিং বা নির্দেশনার পর থেকে সংসদ সদস্যরা এখন আইনগতভাবেই নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপায়ে স্পিকারের চেয়ারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারবেন।