ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় এক প্রান্তিক নারী সবজি বিক্রেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন রাস্তার পাশের একটি নির্জন ঝোপ থেকে তাঁর গলাকাটা ও ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই বর্বরোচিত ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত নারীর নাম পদ্মা রানী মাঝি (৪৮)। তিনি উপজেলার যন্ত্রাইল ইউনিয়নের চর খুলশী চক এলাকার দরিদ্র কৃষক দয়াল মাঝির স্ত্রী ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, রোববার সকালে শান্তিনগর-গোল্লা সড়কের পাশের একটি নিচু মাঠের ঝোপ থেকে পথচারী ও স্থানীয় কৃষকরা তীব্র দুর্গন্ধ পেতে থাকেন। গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে তাঁরা ঝোপের গভীরে এক নারীর রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। মুহূর্তে এ খবর আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় জমান। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে নিহত নারীর স্বজনরা দ্রুত এসে লাশটি পদ্মা রানী মাঝির বলে শনাক্ত করেন। পরে খবর পেয়ে নবাবগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল গিয়ে ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে এবং নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সংসারে চরম অভাব-অনটন থাকায় নিহতা পদ্মা রানী প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে ও স্থানীয় বাজারে পায়ে হেঁটে ঘুরে সবজি বিক্রি করতেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী এই নারী অত্যন্ত পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো গত শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সবজি নিয়ে বিক্রির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। তবে বিকেল গড়িয়ে রাত হলেও তিনি আর বাড়ি ফিরে আসেননি। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে স্বজনরা আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ও আত্মীয়দের বাড়িতে দিনভর খোঁজখবর নিলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
গোল্লা বৌবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, শনিবার সকালে পদ্মা রানী বাজারে এসেছিলেন এবং তাঁর কাছে থাকা সবজিগুলো বিক্রি করেন। কেনাকাটা শেষে ছেলের জন্য সকালের নাশতার রুটি কিনে বেলা সোয়া ১১টার দিকে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তবে বাজারে কেনাকাটার পর নির্জন রাস্তা পার হওয়ার সময়েই তিনি দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন নিহতের মেয়ে ইতি মাঝি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, তাঁদের পরিবার অত্যন্ত সাধারণ এবং কারোর সাথে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত শত্রুতা বা দ্বন্দ্ব ছিল না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সারা দিন কষ্ট করে সবজি বিক্রি শেষে মায়ের কাছে বড়জোর সাত-আটশত টাকা থাকতে পারে। সামান্য এই কটা টাকার জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে এত নিংশসভাবে তাঁকে হত্যা করা হলো, তা তাঁদের মাথায় আসছে না। তিনি অবিলম্বে মায়ের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
ঘটনার বিষয়ে নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু হানিফ জানান, মরদেহের গলার ডান পাশে ধারালো অস্ত্রের বেশ কয়েকটি গভীর ও মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নির্জন ঝোপে লাশটি পড়ে থাকায় রাতে শিয়ালের কামড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক আলামত দেখে পুলিশ ধারণা করছে, দুর্বৃত্তরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করার পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে ঝোপের ভেতর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
পুলিশ ইতোমধ্যে মরদেহের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে। ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ও সময় জানার জন্য লাশ রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের আসল কারণ উদঘাটন এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।


