বাংলাদেশের তরুণ পেসার নাহিদ রানার মধ্যে বিশ্ব ক্রিকেটের সম্ভাব্য সুপারস্টার হয়ে ওঠার সামর্থ্য দেখছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ক্রিকেটার ও খ্যাতিমান ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ। নাহিদের গতি, বাউন্স এবং বয়স বিবেচনায় নিয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী এই ক্যারিবীয় কিংবদন্তি। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে হলে নাহিদকে চোটমুক্ত রেখে নিয়মিত খেলার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচের ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে গত দুই দিনে বেশ কয়েকবার নাহিদের প্রসঙ্গ তুলেছেন বিশপ। অথচ চলমান ম্যাচে বাংলাদেশের একাদশে তো নেই-ই, এমনকি দলেও জায়গা হয়নি এই তরুণ পেসারের। চোটের কারণে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর মাঠে ফেরার সময়ও এখনো নিশ্চিত নয়।
নাহিদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের পেস বোলিং নিয়ে আলোচনায় তাঁর নাম উঠে আসা থেকেই বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের গতির জন্য আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন এই তরুণ। প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের জন্য তাঁর দ্রুতগতির বোলিং ও বাউন্স বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আর সেই সামর্থ্যই বিশপের দৃষ্টিতে নাহিদকে অন্য অনেক তরুণ পেসারের চেয়ে আলাদা করেছে।
বিশপের ভাষায়, ‘আমার বিশ্বাস, নাহিদ বিশ্ব ক্রিকেটের সম্ভাবনাময় সুপারস্টারদের একজন। বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক তরুণ ফাস্ট বোলার উঠে আসছে। নাহিদ তাদের বেশির ভাগের মতোই দ্রুতগতির, এমনকি অনেকের চেয়েও বেশি গতিতে বল করতে পারে।’
নাহিদের বয়স নিয়েও কথা বলেছেন এই ধারাভাষ্যকার। তাঁর মতে, এত অল্প বয়সেই নাহিদ যে গতিতে বল করতে পারেন, তা ভবিষ্যতে তাঁকে আরও বড় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে প্রতিভা থাকলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন সাফল্য ধরে রাখা যায় না। ধারাবাহিকতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং চোট থেকে সুরক্ষিত থাকার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই নাহিদকে সুস্থ রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিশপ। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নাহিদের সেই সামর্থ্য আছে, যা দিয়ে সে বাংলাদেশকে নতুন একটি অধ্যায়ে, নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কারণ, চাইলেই গতি কিনে নেওয়া যায় না। বিশ্বের প্রতিটি দলই নাহিদ রানার মতো একজন বোলার খুঁজছে। তাই ওকে সুস্থ রাখুন।’
বিশপের এই বক্তব্যে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য দ্রুতগতির পেসারের গুরুত্বও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন বোলার খুব বেশি পাওয়া যায় না, যাঁরা নিয়মিত উচ্চগতিতে বল করার পাশাপাশি ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারেন। একজন কার্যকর ফাস্ট বোলার নতুন বলে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো বলেও প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। নাহিদের মধ্যে সেই সম্ভাবনা দেখছেন বিশপ।
গত আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজেও নাহিদকে না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজেও এই পেসারকে পাচ্ছে না বাংলাদেশ। চোটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে তাঁর অনুপস্থিতি দলের জন্য যেমন ক্ষতি, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়ানোর সুযোগ থেকেও আপাতত দূরে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
তবে নাহিদ না থাকলেও বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট বিশপ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজে পেসারদের পারফরম্যান্স তাঁর সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ডারউইনে অনুষ্ঠিত টেস্টে নাহিদকে ছাড়াই জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হাসান মাহমুদ। পরের টেস্টে ম্যাকাইয়ে সাত উইকেট শিকার করেন শরীফুল ইসলাম।
দুই পেসারের এমন পারফরম্যান্স বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে বিকল্পের সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। আগে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে স্পিনারদের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পেসারদের কার্যকারিতা বেড়েছে। বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিততে হলে এই পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশপ।
মিরপুর টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের শুরুর কয়েক ওভারের বোলিং দেখে ক্যারিবীয় পেস বোলিংয়ের স্বর্ণযুগের কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের একসময়কার শক্তিশালী ফাস্ট বোলিং ঐতিহ্যের সঙ্গে এই তুলনা বাংলাদেশের পেসারদের উন্নতি সম্পর্কে তাঁর ইতিবাচক মূল্যায়নই তুলে ধরে।
বিদেশের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্য পেতে হলে শুধু স্পিনার কিংবা একজন নির্ভরযোগ্য পেসারের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। প্রতিপক্ষের কন্ডিশন অনুযায়ী একাধিক কার্যকর ফাস্ট বোলার নিয়ে আক্রমণ সাজাতে হবে। বিশপের মতে, ভালো পেসার খুঁজে বের করা ও তাঁদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
এই উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নাহিদ রানার মতো প্রতিভাবান পেসারদের সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর গতি বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পুনর্বাসন শেষে নিরাপদে মাঠে ফেরা, ফিটনেস ধরে রাখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে খেলার সুযোগ পাওয়া প্রয়োজন।
নাহিদ কবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরবেন, তা নির্ভর করছে তাঁর চোট থেকে সেরে ওঠার অগ্রগতির ওপর। অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর বোলিং শুরু করার কথা থাকলেও সেটিই যে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা, তা নয়। আপাতত বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁর পূর্ণ ফিট হয়ে ফেরার জন্য। আর বিশপের প্রত্যাশা, সুস্থ থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে একসময় বিশ্ব ক্রিকেটের বড় তারকাদের কাতারে জায়গা করে নিতে পারেন এই তরুণ পেসার।


