বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্বে পরিবর্তন আসছে। চলমান এশিয়ান গেমস শেষ হওয়ার পর এই সংস্করণের নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিগার সুলতানা জ্যোতি। তাঁর জায়গায় কে দায়িত্ব নেবেন, তা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত আলোচনায় উঠে এসেছে বাঁহাতি স্পিনার নাহিদা আক্তার ও অলরাউন্ডার সোবহানা মোস্তারির নাম।
নিগার অবশ্য পুরোপুরি নেতৃত্বের বাইরে যাচ্ছেন না। তিনি ওয়ানডে দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন। টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা ই-মেইলে বিসিবিকে জানিয়েছেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। ব্যাটিং ও উইকেটকিপিংয়ে আরও মনোযোগ দেওয়ার জন্যই তিনি সংক্ষিপ্ত সংস্করণের নেতৃত্ব ছাড়তে চান বলে জানা গেছে।
২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব নেওয়ার পর থেকে নিগারই এই সংস্করণে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর অধিনায়কত্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘ এক দশক পর নারী বিশ্বকাপে ম্যাচ জয়ের স্বাদ পায়। ওই টুর্নামেন্টে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যাট ও উইকেটের পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল নিগারের। চার ইনিংসে তিনি করেন ১০৪ রান এবং অংশ নেন সাতটি ডিসমিসালে।
তবে টি-টোয়েন্টিতে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ অপরাজিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে হারে। স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসকে নিয়ে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজেও দলের ফল ছিল মিশ্র। এরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ জয় পায় দুটিতে। এসব ফলাফলের প্রেক্ষাপটে অধিনায়কত্ব নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও নিগার এবার নিজেই সংক্ষিপ্ত সংস্করণের নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
বিসিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ক্রিকবাজ জানিয়েছে, নতুন অধিনায়ক নির্বাচনের আলোচনায় নাহিদা ও সোবহানার নাম গুরুত্ব পাচ্ছে। দুজনই বর্তমান টি-টোয়েন্টি দলের অংশ এবং জাপানে চলমান এশিয়ান গেমসের স্কোয়াডেও রয়েছেন। বাংলাদেশ দলের স্কোয়াডে নাহিদাকে বাঁহাতি স্পিনার এবং সোবহানাকে অলরাউন্ডার হিসেবে রাখা হয়েছে।
নাহিদা আক্তারের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। ২০০০ সালের মার্চে জন্ম নেওয়া এই বাঁহাতি অর্থডক্স স্পিনার ২০১৫ সালে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেন। চলতি এশিয়ান গেমসেও তিনি বাংলাদেশের স্কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তিনি ৪ ওভার বোলিং করে ২৫ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন।
অন্যদিকে সোবহানা মোস্তারিও বর্তমানে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সেটআপের অংশ। এশিয়ান গেমসের দলে তাঁকে অলরাউন্ডার হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে তাঁর নাম আলোচনায় আসা দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিগারের সিদ্ধান্ত বিসিবির কাছে কিছুটা আকস্মিক ছিল বলে ক্রিকবাজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে বোর্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও বিভিন্ন ঘটনায় অসন্তোষের কথাও এসেছে। তবে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যভাবে বিসিবির পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
নিগারের নেতৃত্ব নিয়ে অতীতেও সমালোচনা হয়েছে। সাবেক বাংলাদেশ ক্রিকেটার জাহানারা আলম তাঁর বিরুদ্ধে ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং এককভাবে দল পরিচালনার অভিযোগ তুলেছিলেন। এসব অভিযোগ নিগারের নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় এলেও এগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত; এর সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোচিং স্টাফেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এশিয়ান গেমসের পর বাংলাদেশ নারী দলের কোচিং কাঠামোতে রদবদল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান প্রধান কোচ সরোয়ার ইমরানের জায়গায় সাবেক বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স দলের প্রধান কোচ ডেভিড হেম্পের নামও আলোচনায় রয়েছে। হেম্প এর আগে বাংলাদেশ নারী দলের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
নাহিদা ও সোবহানার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাবেয়া খাতুন ও স্বর্ণা আক্তারের নাম আলোচনায় রয়েছে। রাবেয়া আগে ‘এ’ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে জাতীয় টি-টোয়েন্টি দলের পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব এখনই তাঁদের হাতে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের ভেতরে সতর্কতার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
এশিয়ান গেমসের বর্তমান সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ নারী দল ২০ সেপ্টেম্বর জাপানের নিসশিনে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে খেলবে। বাংলাদেশ চীনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে মাঠে নামতে পারেনি বৃষ্টিতে মাঠ অনুপযোগী হয়ে যাওয়ায়; ম্যাচটি টস ছাড়াই পরিত্যক্ত হয়।
ফলে এশিয়ান গেমস শেষে নিগারের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্বের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিসিবিকে। নাহিদা ও সোবহানা আপাতত আলোচনায় থাকা দুই নাম হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বোর্ডের বৈঠক ও নির্বাচকদের বিবেচনার ওপর। নিগারের ক্ষেত্রে যেমন নেতৃত্বের পাশাপাশি ব্যাটিং ও উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্ব ছিল, নতুন অধিনায়কের ক্ষেত্রে দল পরিচালনার সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


