সকালে নিজ হাতে তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া মেয়েকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাবা। কয়েক ঘণ্টা পর সেই মেয়েকেই বাসার প্রধান ফটকের সামনে দ্রুতগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন তিনি। ঘটনাটি চট্টগ্রাম নগরের খুলশি এলাকায়। আহত শিশুটির বাবা আনসারুল করিম একজন পুলিশ কর্মকর্তা। নিজের মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার হতাশা থেকেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন—নিজের সন্তানের নিরাপত্তাই যেখানে নিশ্চিত করা কঠিন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
সোমবার বেলা দেড়টার দিকে খুলশি জালালাবাদ সোসাইটির ৩ নম্বর সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহত শিশুটির নাম নাওয়াল আনসারী। সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।
নাওয়ালের বাবা আনসারুল করিম চট্টগ্রাম নগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর বিভাগে কর্মরত। তিনি জানান, সকালে প্রায় আটটার দিকে তিনি নিজেই মেয়েকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন। বিদ্যালয় ছুটির পর নাওয়াল একটি ভাড়া করা গাড়িতে করে বাসার সামনে আসে। গাড়ি থেকে নেমে ভবনের প্রধান ফটকের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এসে তাকে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কায় শিশুটি ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায়। এতে তার দুই হাত, মাথা, ঠোঁট, কপাল ও পুরো মুখমণ্ডলে গুরুতর আঘাত লাগে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাকে প্রথমে নগরের জিইসি এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনার পর সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আনসারুল করিম নিজের ক্ষোভ ও হতাশার কথা জানান। সেখানে তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের সন্তানের নিরাপত্তাই যখন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন অন্য মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে কতটা সফল হওয়া যাচ্ছে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
মঙ্গলবার সকালে আনসারুল করিম বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর অনেক চালক দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। তাঁর অভিযোগ, দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত অটোরিকশাটি অবৈধ ও নিবন্ধনবিহীন ছিল। এসব যানবাহনের নির্দিষ্ট গতিসীমা না থাকা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও বৈধ চালনার অনুমোদন নিয়ে যথাযথ তদারকি না থাকায় পথচারী, বিশেষ করে শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও তিনি মনে করেন।
তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, অবৈধ অটোরিকশার চালকদের কাছে নগরবাসী আর কত দিন নিরাপত্তাহীন থাকবে। প্রশিক্ষণ ও বৈধ চালনার অনুমোদন ছাড়া এসব যান চালানোর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আনসারুল করিমের কর্মজীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করার আগে তিনি খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বড় ধরনের অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারলেও শহরের সড়কে বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
চট্টগ্রাম নগরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এসব যান অন্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, আবার কখনো সরাসরি পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে আহত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
এসব যান নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হয়েছে। মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিষিদ্ধ করার পরও নগরের অভ্যন্তরীণ সড়ক ও অলিগলিতে এগুলোর উপস্থিতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অভিযান জোরদার হলে অনেক ক্ষেত্রে নগরের ছোট সড়ক ও আবাসিক এলাকার রাস্তায় এসব যান বেশি দেখা যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
চকবাজার, ডিসি রোড, বাকলিয়া এক্সেস রোডসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর মূল সড়কেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা যায়। ফলে এসব যান নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অভিযান ও বিধিনিষেধ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আনসারুল করিমের দাবি, নগরের কোন সড়কে এসব অটোরিকশা চলতে পারবে, কোথায় চলতে পারবে না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ও কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাঁর মতে, কোনো অবৈধ অটোরিকশা জব্দ করার পর সেটি আবার সড়কে ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
একটি শিশুকে বাসার গেটের সামনে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনাটি তাই শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের বিষয় নয়; এটি নগরের সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বিদ্যালয়, আবাসিক এলাকা ও জনবহুল সড়কের কাছে দ্রুতগতির যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি না থাকলে শিশু ও পথচারীদের ঝুঁকি থেকেই যাবে।



