জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নুরন্নবী সরকার দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আদর্শিক বিচ্যুতি ও একনায়কতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন। তিনি দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র পাঠানোর কথাও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নুরন্নবী সরকার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তিনি এনসিপির কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেও কাজ করেছেন। এ সময় দলের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, আদর্শিক অবস্থান এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নুরন্নবীর অভিযোগ, দলের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আদর্শিক বিচ্যুতি এবং একনায়কতান্ত্রিক আচরণের কারণে দলের ভেতরে যে প্রত্যাশা নিয়ে নেতাকর্মীরা যুক্ত হয়েছিলেন, তা পূরণ হচ্ছে না।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের আত্মসম্মান ও আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে সব ধরনের সাংগঠনিক পদ এবং প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় দায়িত্ব পালনকালে সহযোগিতা করা দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও কুড়িগ্রামবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নুরন্নবী সরকার। তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত অসন্তোষের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে আপত্তির বিষয়টিও উঠে আসে।
এদিকে নুরন্নবীর অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন এনসিপির কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আহ্বায়ক মুকুল মিয়া। তাঁর দাবি, পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে নুরন্নবী সরকার বেশ কিছুদিন ধরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ফলে সংবাদ সম্মেলনে দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আদর্শিক বিচ্যুতি ও একনায়কতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা তাঁর ব্যক্তিগত ও মনগড়া অভিযোগ।
মুকুল মিয়া বলেন, নুরন্নবীর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত একান্তই ব্যক্তিগত। এ বিষয়ে তাঁর কিছু বলার নেই।
দুই নেতার বক্তব্যে পদত্যাগের কারণ নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে। নুরন্নবী যেখানে দলের নীতিগত ও সাংগঠনিক অবস্থানকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, সেখানে জেলা আহ্বায়কের দাবি, তাঁর নিষ্ক্রিয়তার পেছনে রয়েছে পারিবারিক সমস্যা।
রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোয় জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন বিস্তার, কর্মী-সমর্থকদের সম্পৃক্ত রাখা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে জেলা পর্যায়ের সমন্বয় বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় এনসিপির কুড়িগ্রাম জেলা শাখার একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদত্যাগের ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে নুরন্নবী সরকারের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি। তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে কি না, কিংবা এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে দলের পরবর্তী অবস্থান কী হয়, তা এখন দেখার বিষয়।


