নীলফামারীর জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফারুক ভুঁইয়া আর নেই

নীলফামারীর জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার ফারুক ভুঁইয়া আর নেই। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বুধবার (১৪ অক্টোবর) ভোর ৬টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তাঁর মৃত্যুতে নীলফামারীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

‘বাংলাদেশের মাইনষিগিলা তোমাক দেওছো নিমন্ত্রণ, নীলফামারী একবার বেড়ে যাও’—এই লোকগানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন ফারুক ভুঁইয়া। নীলফামারীর মানুষের জীবনযাপন, আতিথেয়তা ও স্থানীয় খাবারের বৈশিষ্ট্যকে উপজীব্য করে রচিত গানটি কয়েক দশক ধরে উত্তরাঞ্চলের শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়। বিভিন্ন মঞ্চে তাঁর কণ্ঠে গানটি শোনার জন্য দর্শক-শ্রোতারা অপেক্ষা করতেন আগ্রহ নিয়ে।

গানটির কথা নিজেই লিখেছিলেন ফারুক ভুঁইয়া। এতে সুরারোপ করেছিলেন খ্যাতিমান ভাওয়াইয়া শিল্পী মহেশ চন্দ্র রায়। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘অন্তরঙ্গ’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে গানটি প্রথম প্রচারিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে গানটি নীলফামারী ছাড়িয়ে পরিচিতি পায় বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলে। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গানটি একসময় শিল্পীর পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়।

তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গানটির আবেদন কমেনি। নীলফামারীর পরিচিতি তুলে ধরতে কিংবা জেলার মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলতে গিয়ে আজও গানটির কথা স্মরণ করেন অনেকে। স্থানীয় ভাষার ব্যবহার, সহজ সুর ও নিজ এলাকার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ গানটিকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।

বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন ফারুক ভুঁইয়া

ফারুক ভুঁইয়া শুধু একটি জনপ্রিয় গানের শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বহুমুখী সংগীতপ্রতিভার অধিকারী। মঞ্চে গান পরিবেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। লোকজ ঐতিহ্য, আঞ্চলিক ভাষা ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্প তাঁর গানে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পাওয়া গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হাজরা বিবির কান্দন শুনলে দুঃখে কইলজা যায় ফাটি’। এ ছাড়া ‘দেওয়ানা দেওয়ানা আমি দেওয়ানা হইলাম রে, আছির বাবার লাগি আমি দেওয়ানা হইলাম রে’সহ বেশ কিছু গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। গীতিকার ও সুরকার হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল। নিজের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় সংগীতধারাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

নীলফামারীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান কিংবদন্তি শিল্পী প্রয়াত ফিরোজ সাঁই ও পিলু মমতাজের স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া। নিজের উদ্যোগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ফিরোজ সাঁই ও পিলু মমতাজ স্মৃতি সংসদ। সংগঠনটির মাধ্যমে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন গুণী শিল্পীকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সংগীতাঙ্গনের প্রবীণ ও গুণী ব্যক্তিত্বদের অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের পরিচিত করে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি।

চলতি বছরের ২৯ আগস্ট নীলফামারী শহীদ মিনারে স্মৃতি সংসদটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ফারুক ভুঁইয়া। দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া তাঁর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতি দায়বদ্ধতারই পরিচয় বহন করে।

শেষ মঞ্চ পরিবেশনা রাজধানীতে

জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফারুক ভুঁইয়া। চলতি বছরের ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত কালজয়ী গানের একটি অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। সহকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ মঞ্চ পরিবেশনা।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে মঞ্চে মঞ্চে গান গেয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সেই স্মৃতিই ফিরে আসছে সহকর্মী ও ভক্তদের আলোচনায়। বিশেষ করে নীলফামারীর মানুষের কাছে তিনি ছিলেন নিজ এলাকার কথা ও সংস্কৃতিকে গানের মাধ্যমে তুলে ধরা একজন পরিচিত শিল্পী।

হারোয়া গ্রামে জন্ম, রেখে গেলেন স্ত্রী ও দুই মেয়ে

ফারুক ভুঁইয়া ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নীলফামারী পৌরসভার হারোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম আব্দুল গণি ভূঁইয়া একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়েকে রেখে গেছেন। তাঁর পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি দীর্ঘ সংগীতযাত্রাও তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল। নিজের লেখা গান, সুর ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তিনি নীলফামারীর আঞ্চলিক সংগীতকে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রেখেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন ফারুক ভুঁইয়া। প্রথমে তাঁকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে হৃদরোগ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার ভোর ৬টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

বুধবার বাদ মাগরিব নীলফামারী কলেজ স্টেশন আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে নীলফামারী পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

ফারুক ভুঁইয়ার মৃত্যুতে নীলফামারী হারাল নিজস্ব ভাষা, জীবন ও সংস্কৃতিকে গানে ধারণ করা এক পরিচিত কণ্ঠশিল্পীকে। তাঁর লেখা ও গাওয়া গান, বিশেষ করে নীলফামারীকে ঘিরে রচিত জনপ্রিয় লোকসংগীতটি, শ্রোতাদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংগীতের যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, তা-ই হয়ে থাকবে শিল্পীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অন্যতম স্মারক।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।