বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী রন্টি দাশ যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত ‘ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ সেরা মেলোডি গায়িকা (নারী) বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেছেন। আধুনিক বাংলা গান, লোকসংগীত ও চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে পরিচিতি পাওয়া এই শিল্পীর সংগীতজীবনে যুক্ত হলো নতুন একটি সম্মাননা। অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী রিজিয়া পারভীন।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলা গানের বিভিন্ন ধারায় কাজ করছেন রন্টি দাশ। নিজস্ব কণ্ঠশৈলী ও গায়কির বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি গড়ে তুলেছেন তিনি। সংগীতের একাধিক শাখায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীজীবনকে বৈচিত্র্যময় করেছে। ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডে পাওয়া এই স্বীকৃতি তাঁর সংগীতযাত্রার উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে যুক্ত হলো।
২০০৬ সালে জনপ্রিয় টেলিভিশন সংগীত প্রতিযোগিতা ‘ক্লোজআপ ওয়ান: তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে পরিচিতি পান রন্টি দাশ। প্রতিযোগিতাটির মধ্য দিয়ে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান তিনি। এরপর আধুনিক বাংলা গান, লোকসংগীত ও চলচ্চিত্রের গানে নিয়মিত কাজ করে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। বাংলা গানের বিভিন্ন ধারায় তাঁর অংশগ্রহণ শ্রোতাদের কাছে তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
চলচ্চিত্রের গানেও রয়েছে রন্টির পরিচিতি
রন্টি দাশের সংগীতজীবনে প্লেব্যাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের একাধিক চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। তাঁর প্লেব্যাক করা সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘শুভ বিবাহ’, ‘খোঁজ: দ্য সার্চ’, ‘কর্তৃত্ব’, ‘দ্য স্পিড’, ‘অস্ত্রপ্রয়োগ’ ও ‘বস্তির ছেলে কোটিপতি’।
চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংগীতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা তুলে ধরেছেন এই শিল্পী। চলচ্চিত্রের গান সাধারণত পর্দার দৃশ্য, চরিত্রের আবেগ ও গল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই এ ধরনের গানে কণ্ঠ দেওয়ার ক্ষেত্রে সুরের পাশাপাশি আবেগ প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
রন্টি দাশের পরিচিত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দেখো আমার খুশিতে’, ‘হ্যালো বৃষ্টি’, ‘হৃদয় যেখানে’, ‘রং’, ‘উড়ালিয়া’, ‘ডাকাতি’, ‘বাহার বাড়ি’, ‘একেলা’ ও ‘অভিমানী’। এসব গানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধারার সংগীতে তাঁর অংশগ্রহণ শ্রোতাদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া রন্টি দাশের সংগীতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ছোটবেলা থেকেই। পরিবারের উৎসাহ ও সহযোগিতা তাঁর সংগীতচর্চাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। তাঁর বাবা সুবল কান্তি দাশ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মা লাকি রানী দাশ একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। শৈশবের সেই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাঁকে পেশাদার সংগীতজীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
নিউইয়র্কে সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করছেন রন্টি দাশ। সেখানে সংগীতচর্চার পাশাপাশি সংগীতশিক্ষার প্রসারেও কাজ করতে চান তিনি। এ লক্ষ্যে ‘রন্টি’স মিউজিক কিচেন’ নামে একটি সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা করছেন এই শিল্পী।
প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটিতে শাস্ত্রীয় সংগীত, নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, দেশাত্মবোধক গান, আধুনিক গান ও লোকসংগীত শেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কণ্ঠের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে সংগীতের বিভিন্ন ধারায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী শেখার সুযোগ পাবেন।
উদ্যোগটির আওতায় অনলাইন ও সরাসরি—দুই পদ্ধতিতেই সংগীত শেখার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দূরত্ব বা যাতায়াতের সীমাবদ্ধতার কারণে যাঁদের পক্ষে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়া কঠিন, তাঁরাও অনলাইনে শেখার সুযোগ পেতে পারেন। সরাসরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠচর্চা ও গায়কির উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের অন্যতম মানবিক দিক হলো, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে সংগীতশিক্ষার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা। সংগীত শেখার সুযোগকে আরও সহজলভ্য করা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে গানের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই এর প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সংগীতচর্চা কেবল পেশাদার শিল্পী হওয়ার প্রস্তুতি নয়; এটি সৃজনশীলতা বিকাশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও একটি মাধ্যম। বিভিন্ন ধারার গান শেখার সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা বাংলা সংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রও খুঁজে পেতে পারে।
ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-এ পাওয়া স্বীকৃতি রন্টি দাশের দীর্ঘ সংগীতজীবনে নতুন একটি অর্জন হিসেবে যুক্ত হয়েছে। একদিকে তিনি নিজের গানের জগতে কাজ চালিয়ে যেতে চান, অন্যদিকে সংগীতশিক্ষার উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে গানের চর্চা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেও বাংলাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার প্রচেষ্টা তাঁর ভবিষ্যৎ কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে।



