বিশেষ প্রতিবেদক: নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় মুরগি চুরির অপবাদ দিয়ে চল্লিশোর্ধ্ব এক নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সময় নির্যাতনের চিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করে স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে দেয়া হলে তা নিয়ে এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী সেনবাগ থানায় চারজনকে নামীয় আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যেই মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সেনবাগের একটি গ্রামে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। নির্যাতিত নারীর স্বামী প্রবাসে থাকার কারণে তিনি বাড়িতে একাই বসবাস করেন এবং গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এজাহারের তথ্যমতে, আসামিদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তার জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। ঘটনার দিন রাতে ভুক্তভোগী নারী ঘরে বসে তার মেয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। ঠিক সে সময় কয়েকজন লোক বসতবাড়ির টিনের দরজা জোরপূর্বক খুলে ভেতরে প্রবেশ করে।
হামলাকারীরা ঘরে ঢুকেই ওই নারীর মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয় এবং তার ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে পরনের কাপড় টেনেহিঁচড়ে তার শ্লীলতাহানি ঘটানো হয় এবং জোরপূর্বক পাশের একটি বাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে অভিযুক্তরা তাদের নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এ সময় সুযোগ বুঝে ঘরে থাকা সোনার চেইনও ছিনিয়ে নেয় দুষ্কৃতকারীরা।
পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি ওই নারীর বিরুদ্ধে খামার থেকে মুরগি চুরির কাল্পনিক অভিযোগ তোলে। এরপর রাত ১টা পর্যন্ত টানা কয়েক ঘণ্টা তাকে একটি গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রেখে বেধড়ক কিল-ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মেরে গুরুতর আহত করা হয়। নির্যাতনকারীরা ভুক্তভোগীর নিজ বসতঘর থেকে জোর করে চারটি মুরগি এনে সেগুলো সে চুরি করেছে বলে নাটক সাজায়।
ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন পুরো নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন। ধারণ করা ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মধ্যবয়সী ওই নারীকে একটি গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। চারপাশে কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে ধরে ছবি ও ভিডিও তৈরিতে মেতে আছে। অসহায় নারীটি জনসম্মুখে লজ্জায় মুখ ঢাকার চেষ্টা করলে একজন লোক এসে তার মুখের কাপড় টেনে সরিয়ে দেয়। পরে আরেক ব্যক্তি জোর করে তার হাতে কয়েকটি মুরগি ধরিয়ে দিয়ে চোর সাব্যস্ত করার অপচেষ্টা চালায়।
পরবর্তীতে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে নির্যাতিত নারী স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মুরগি চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে শারীরিক নির্যাতন, মারধর ও শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। পূর্বশত্রুতার জের ধরে আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করতেই এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটানো হয়েছে।” তিনি অবিলম্বে জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি জানান।
অন্যদিকে, নির্যাতনের শিকার নারীর দায়ের করা মামলাটিকে সম্পূর্ণ হয়রানিমূলক দাবি করে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে স্থানীয়দের একটি অংশ। তাদের দাবি, মুরগি চুরির মূল ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে থানায় এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান জানান, খবর পেয়ে তিনি অকুস্থলে গিয়েছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী, নারীটি সেখানে চুরির কথা স্বীকার করেন এবং তার ঘর থেকে ৪৫টি মুরগি উদ্ধার করে খামারির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে রাত ১টার দিকে ভুক্তভোগী নারী তার স্বজনদের নিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়িতে গিয়ে শ্লীলতাহানি ও গাছে বেঁধে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে চলে আসেন।
ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিম জানান, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। প্রাথমিক তদন্তে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা মিলেছে। ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যেই এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

