পদোন্নতি বিতর্কে প্রশাসনে বাড়ছে অসন্তোষ ও স্থবিরতা

জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ এবং ক্ষোভ ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং বিদ্যমান নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ না হওয়ায় প্রশাসনের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন, হতাশা এবং আস্থাহীনতা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সূত্রগুলো বলছে, উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদে পদোন্নতি ঘিরে দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। বঞ্চিত বলে দাবি করা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া বিতর্কিত পদোন্নতির ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং এতে প্রশাসনের ভেতরে পেশাগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার মধ্য থেকে সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও পরবর্তী পর্যায়ে একই ব্যাচের পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বরং অন্য ব্যাচের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদোন্নতির আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদমর্যাদা ও ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে বড় ধরনের ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক কাঠামোয় জ্যেষ্ঠতা দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রশাসনের ভেতরে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পদোন্নতি নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ ছাড়াই রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কিংবা বিশেষ বিবেচনায় কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, বর্তমান সময়েও সেই প্রবণতার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কয়েকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মনে করেন, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট, গ্রহণযোগ্য এবং স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা না হলে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি প্রশাসনের কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোবলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

তাদের মতে, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পায়, যা কর্মপরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও অনীহা বা মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতিনিষ্ঠ পদোন্নতি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান অসন্তোষ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, পক্ষপাতমূলক পদোন্নতি ও পদায়নের অভিযোগ অব্যাহত থাকলে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে।

তাদের মতে, জনসেবামুখী, দক্ষ এবং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা, যোগ্যতা এবং জ্যেষ্ঠতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম এবং জনসেবার মানের ওপর পড়তে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।