অধ্যাপক মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
সম্প্রতি দেশের একজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী এক সাক্ষাৎকারে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণীর লেখকও মনে করেন না’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে তুমুল বিতর্ক ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই বিতর্ককে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক লাইনের ট্রল কিংবা অন্ধ সমালোচনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জ্যাক লাকা এবং আহমদ ছফার মননশীলতার আলোয় বিশ্লেষণ করলে এই নেতিবাচক মূল্যায়নের পেছনে এক আদিম ও অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক খেলার রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, শহীদুল জহির নিজেই তাঁর গল্প ও উপন্যাসে বাঙালির এই পরশ্রীকাতরতা কিংবা সমষ্টিগত ঈর্ষাকে নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করে গেছেন। তাঁর বিখ্যাত ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের অভাবনীয় বৈভব ও শ্রী দেখে পুরো সুহাসপুর গ্রামের মানুষ যেভাবে ফিসফিসানি, কুৎসা আর গুজবের কুয়াশা তৈরি করেছিল, তা ছিল বাঙালির চিরন্তন মানসিকতার এক অমোঘ রূপ। জহির দেখিয়েছেন, সমাজ যখন অন্যের ভাষার সার্বভৌমত্ব, মেধা বা সাফল্য সহ্য করতে পারে না, তখন সে সেই সফল মানুষকে টেনে নিচে নামানোর জন্য সমষ্টিগত হিংস্রতার আশ্রয় নেয়। আজ যখন জহিরকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলে খারিজ করার চেষ্টা করা হয়, তখন ইতিহাস যেন জহিরের সেই উপন্যাসের পাতা থেকেই বাস্তবে ফিরে আসে।
বাঙালির—বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের এই মনস্তত্ত্বকে সবচেয়ে নির্মমভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন লেখক ও চিন্তাবিদ আহমদ ছফা। তাঁর কালজয়ী ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন, বাঙালি মুসলমানের সমাজটি একটি আত্মকেন্দ্রিক সমাজ। এর চোখ বাইরের দিকে অবারিত নয়, নিজের চারিদিকেই ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে। এই সমাজের মানুষ কোনো মহৎ সৃষ্টিতে আনন্দ পায় না, কিন্তু অন্যের পতনে একপ্রকার বিকৃত তৃপ্তি অনুভব করে। নিজেরা বড় হতে পারে না বলে অন্য কেউ বড় হলে তাকে টেনে নিচে নামানোর এক সর্বগ্রাসী বাসনা এই সমাজকে তাড়িয়ে ফেরে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি যখন জহিরের মতো একজন নিভৃতচারী মৌলিক রূপকারকে এভাবে খারিজ করে দেন, তখন আহমদ ছফার ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থের সেই অমোঘ বক্তব্যটিই সত্য প্রমাণিত হয়। ছফা লিখেছিলেন, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা আসলে সুবিধাবাদী এবং পরনিন্দুক। নিজেরা কোনো নতুন সত্য আবিষ্কার করতে পারেন না, অথচ অন্য কেউ সত্য বললে বা সৃষ্টিশীল কিছু করলে তা সহ্য করার ক্ষমতাও তাদের নেই।
মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব আছে, যার নাম ‘নার্সিসিজম অব স্মল ডিফারেন্সেস’ বা ক্ষুদ্র পার্থক্যের অহমিকা। যখন দুটি সমগোত্রীয় সত্তা কাছাকাছি থাকে—যেমন দুজনেই যদি ফরাসি তত্ত্ব, নিম্নবর্গীয় ইতিহাস, ইউরোপীয় দার্শনিক চিন্তা ও মননশীলতা নিয়ে কাজ করেন—তখন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে অপরপক্ষকে তীব্র আক্রমণ করার এক অবচেতন তাড়না তৈরি হয়। জহির যখন তাঁর ‘জাদুবাস্তব’ গদ্যে পাঠকদের মগজ জয় করে নেন, তখন তাত্ত্বিক জগতের সমকক্ষতার কারণে হয়তো কোনো বুদ্ধিজীবীর অবচেতন অহং (Ego) আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ফ্রয়েডীয় ‘প্রজেকশন’ তত্ত্ব বলে, ব্যক্তি যখন নিজের ভেতরের কোনো সুপ্ত খামতি বা সীমাবদ্ধতা (যেমন মৌলিক সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টির অভাব) সরাসরি মেনে নিতে পারে না, তখন সে অন্যের সেই অসামান্য সৃজনশীলতাকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলে খাটো করে নিজের মনকে শান্ত করতে চায়।
ফরাসি মনঃসমীক্ষক জ্যাক লাকা আবার মনে করতেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা সব সময় অন্যের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। লাকার ভাষায়, পরশ্রীকাতর ব্যক্তি মূলত অন্য ব্যক্তির কেবল ‘প্রাপ্তি’ দেখে কাতর হয় না, সে কাতর হয় অন্যের পরম আনন্দ বা ‘jouissance’ দেখে। শহীদুল জহির তাঁর দীর্ঘ ও গোলকধাঁধাময় গদ্যে ভাষার যে সার্বভৌমত্ব ও নান্দনিক আনন্দ তৈরি করেছেন, তা অনেক বুদ্ধিজীবীর অতি-তাত্ত্বিক ও উদ্ধৃতি-নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক ভাষার বলয়কে এক মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তাই জহিরকে সম্পূর্ণ খারিজ (Foreclosure) করে দিয়ে তাঁরা মূলত সাহিত্য বিচারের সর্বোচ্চ মাপকাঠি এবং শেষ কথাটি বলার চাবিকাঠি—অর্থাৎ ‘পরম অন্যের দৃষ্টি’ (The Gaze of the Big Other) নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চান।
শহীদুল জহিরের উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের ট্রাজেডির পর যেমন গ্রামের মানুষের মনে এক বিকৃত সাময়িক স্বস্তি নেমে এসেছিল, জহিরকে তৃতীয় শ্রেণীর লেখক বলে চাবুক মারার ভেতরেও কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও তাঁদের অন্ধ অনুসারীদের অবচেতন মন ঠিক একই ধরনের পঙ্কিল তৃপ্তি পেতে চাইছে। জ্যাক লাকার মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বে ‘দ্যা-নেম-অব-দ্যা-ফাদার’ একটি অত্যন্ত মৌলিক এবং কেন্দ্রীয় ধারণা। উদ্ধৃতি-নির্ভর বুদ্ধিজীবীর অনুসারীদের কাছে তিনি এক ধরনের ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক পিতা’ বা ‘নেম-অব-দ্যা-ফাদার’ এর ভূমিকায় অবর্ণী হন। তিনি যখন ফতোয়া দিয়ে বলেন জহির ‘তৃতীয় শ্রেণীর লেখক’, তখন তাঁর অনুসারীরা সেই অনুচ্চারিত ‘পিতৃ আইন’ বা অনুশাসনকে পরম সত্য বলে মেনে নেয় এবং জহিরের সৃষ্টিশীলতাকে খারিজ করে এক ধরনের পরানন্দ বা ‘শ্যাডেনফ্রয়ডে’ লাভ করে।
দিনশেষে আহমদ ছফার আরেকটি অমোঘ বাক্যই চিরন্তন সত্য হয়ে সামনে আসে, “বাঙালি চরিত্রের সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হলো সে গুণীর কদর করিতে জানেনা, কিন্তু গুণী মরিয়া গেলে তার শ্রাদ্ধ করিতে ভালোবাসে।” তাত্ত্বিক ফতোয়া দিয়ে শহীদুল জহিরের সেই জাদুকরি গদ্যকে পাঠকের মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফতোয়া বা অবমূল্যায়ন জহিরের সাহিত্যকে ম্লান করতে পারবে না; তাঁর সাহিত্য নিজস্ব মহিমা ও শ্রী-তেই সর্বদা উজ্জ্বল থাকবে।
অধ্যাপক মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়