খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুন ২০২৬, ১২:৭ পিএম
চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভায় পাঁচ বছর বয়সী শিশু মো. জায়হানকে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দী করে রাখার ঘটনায় তিন প্রতিবেশীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত জায়হান পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার বাসিন্দা মো. শাহজাহান ও জোবাইদা বেগমের একমাত্র পুত্র সন্তান। গত মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) দুপুর থেকে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার গভীর রাতে অভিযুক্তদের ঘরসংলগ্ন ময়লার স্তূপ থেকে তার বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ একই এলাকার প্রতিবেশী মো. সাইফুদ্দিন, তাঁর স্ত্রী শানু আক্তার এবং তাঁদের ১৯ বছর বয়সী মেয়ে সাদিয়া সুলতানাকে আটক করার পর তাঁরা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ির আড়াল থেকে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয় শিশু জায়হান। সন্তানকে না পেয়ে স্বজনরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অন্তর্ভুক্ত করেন। জায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর অপহরণকারীরা একটি চিরকুট পাঠিয়ে পরিবারের কাছে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
তদন্তে নেমে পুলিশ ওই চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরে তদন্তের পরিধি বিস্তার করে। বুধবার দুপুরে সন্দেহভাজন হিসেবে প্রতিবেশী সাইফুদ্দিন, তাঁর স্ত্রী শানু আক্তার ও কন্যা সাদিয়া সুলতানাকে আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আটক ব্যক্তিরা জায়হানকে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং তাঁদের প্রদর্শিত ও নির্দেশিত স্থান—বাড়ির পেছনের একটি ময়লার স্তূপ থেকে বুধবার গভীর রাতে জায়হানের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্ত মো. সাইফুদ্দিনের আচরণ ছিল অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ। জায়হান নিখোঁজ থাকার সময় তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এবং পরিবারের সন্দেহ এড়াতে স্বজনদের সঙ্গে অনুসন্ধানে যোগ দেন। তিনি জায়হানের খোঁজে বাড়ির পাশের পুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিতে সশরীরে অংশ নেন। এমনকি একপর্যায়ে তিনি নিখোঁজ জায়হানের বাবা মো. শাহজাহানের সঙ্গে সামনাসামনি বসে চা-ও পান করেন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করার কারণে শাহজাহানের পরিবার কোনোভাবেই সাইফুদ্দিনকে সন্দেহ করতে পারেনি।
নিহত শিশুর মা জোবাইদা বেগম শোকাতুর কণ্ঠে জানান, হত্যার পর অভিযুক্তরা তাঁদের সঙ্গেই ঘুরে বেড়িয়েছে। অপহরণের পর একপর্যায়ে তিনি দূর থেকে ছেলের কণ্ঠস্বরের মতো “ও মা” ডাক শুনেছিলেন এবং সেটি তাঁর ছেলের কি না জানতে চাইলে প্রতিবেশীরা বিভ্রান্তি তৈরি করে বলে যে, সেটি অন্য কোনো বাচ্চার কণ্ঠস্বর ছিল।
চট্টগ্রামের জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম এ বিষয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। তিনি জানান, মুক্তিপণ দাবি করা চিরকুটের লেখার সঙ্গে সাইফুদ্দিনের মেয়ে সাদিয়া সুলতানার হাতের লেখার হুবহু মিল খুঁজে পাওয়ায় পুলিশ আসামিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, মূল অভিযুক্ত মো. সাইফুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর আপন চাচাতো ভাইয়ের দীর্ঘদিনের পারিবারিক জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছিল। সেই প্রতিপক্ষ বা চাচাতো ভাইকে একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই সাইফুদ্দিন এই পাঁচ বছরের নিষ্পাপ শিশুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন, যাতে করে দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ওপর বর্তায়। ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক তদন্তে শিশুটির মাথায় হাতুড়ি জাতীয় ভারী বস্তু দিয়ে আঘাতের সুনির্দিষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে জায়হান ছিল পরিবারের ছোট সন্তান। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে পটিয়া ডাকবাংলা ও থানা সংলগ্ন এলাকায় সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এই ঘটনায় পটিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ড এবং তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টস নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিবরণ | সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ফ্যাক্টস |
| ১. | নিহত ভুক্তভোগী | মো. জায়হান (বয়স: ৫ বছর) |
| ২. | পিতামাতার পরিচয় | মো. শাহজাহান ও জোবাইদা বেগম |
| ৩. | ঘটনাস্থল | দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়া, ৮ নং ওয়ার্ড, পটিয়া পৌরসভা, চট্টগ্রাম। |
| ৪. | নিখোঁজের তারিখ | ১৬ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার (দুপুর) |
| ৫. | লাশ উদ্ধারের সময় | ১৭ জুন ২০২৬, বুধবার (গভীর রাত) |
| ৬. | দাবীকৃত মুক্তিপণ | চিরকুটের মাধ্যমে ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা |
| ৭. | গ্রেপ্তারকৃত আসামিগণ | মো. সাইফুদ্দিন, শানু আক্তার এবং সাদিয়া সুলতানা (১৯) |
| ৮. | হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ | জমিজমা বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষ ও চাচাতো ভাইকে ফাঁসানো। |
| ৯. | প্রধান আলামত | সাদিয়া সুলতানার হাতের লেখার সাথে মুক্তিপণের চিরকুটের লেখার মিল। |
| ১০. | শারীরিক আঘাতের ধরন | মাথার পেছনে ভারী বস্তু বা হাতুড়ি দিয়ে আঘাতের চিহ্ন। |
মন্তব্য