গাজীপুরের টঙ্গীতে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন এবং গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মাইনুর রহমান তানভীর (২৪) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শারমিন নাহার সীমার (২৩) অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। একপর্যায়ে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পরও বন্ধ হয়নি নির্যাতন। সর্বশেষ নির্যাতনের পর তাঁকে বাসে তুলে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
এ ঘটনায় শারমিনের বাবা ১৮ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শারমিনের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মাইনুর রহমান তানভীরের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে রয়েছে ১৯ মাস বয়সী একটি ছেলেসন্তান। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের টাকা চেয়ে শারমিনকে চাপ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ। টাকা দিতে না পারলে তাঁকে গালাগাল, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হতো। একপর্যায়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত ১৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তানভীর আবারও যৌতুকের টাকা দাবি করেন। শারমিন টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করা হয়। এ সময় লোহার পাইপ ও কাঠের লাঠি দিয়ে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেছেন শারমিন।
নির্যাতনের পর বাসে তুলে দেওয়ার অভিযোগ
শারমিনের বর্ণনা অনুযায়ী, নির্যাতনের পর ১৮ অক্টোবর বিকেলে তাঁকে বাসা থেকে বের করে একটি বাসে তুলে দেন তানভীর। বাসটি গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় পৌঁছালে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন তিনি। পরে বাসের হেলপারের সহায়তায় বাস থেকে নেমে যেতে সক্ষম হন শারমিন। এ সময় তানভীর সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
বাস থেকে নেমে শারমিন তাঁর বাবাকে ফোন করে ঘটনার বিস্তারিত জানান। খবর পেয়ে তাঁর বাবা এলেঙ্গায় গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। পরে আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, শারমিনের ওপর নির্যাতনের ঘটনা শুধু শারীরিক আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মানসিক চাপের মধ্যেও রাখা হতো। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
মামলা নিয়েছে পুলিশ, গ্রেপ্তারের উদ্যোগ
ঘটনার বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদুল আলম বলেন, টঙ্গী থেকে শারমিনকে নিয়ে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় যাওয়া হয়েছিল। ঘটনাস্থল টঙ্গী হওয়ায় সেখানকার থানায় মামলা নেওয়া হয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ওসি ঘটনাটিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের জন্য আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে এবং যেকোনো সময় এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাইনুর রহমান তানভীরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়াও জানা সম্ভব হয়নি।
শিশুসন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় শারমিন
মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৯ মাসের শিশুসন্তানকে নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন শারমিন নাহার সীমা। যে সংসারে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই সংসারেই নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ তাঁকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
শারমিন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত স্বামীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগের পাশাপাশি শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন প্রতিরোধে আইনগত বিধান রয়েছে। যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুক দাবি করা, দেওয়া ও নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে, অভিযোগের ধরন ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শারীরিক নির্যাতন কিংবা হত্যাচেষ্টার অভিযোগও প্রযোজ্য আইনের আওতায় বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ঘটনায় কোন কোন ধারায় বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে মামলার নথি, তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণের ওপর।
শারমিনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।


