খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বর্তমানে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সংঘটিত এক ভয়াবহ হামলার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক চরম অবনতির শিকার হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় নিবন্ধিত বিমানগুলোর ওপর পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের যে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল, তার মেয়াদ পুনরায় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের এই কঠোর অবস্থানের ফলে দক্ষিণ এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক আকাশপথের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি, ২০২৬) পাকিস্তান এয়ারপোর্টস অথরিটি (পিএএ) এক দাপ্তরিক বার্তার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভারতীয় বিমানগুলোর ওপর এই বিধিনিষেধ ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোর ৫টা (পাকিস্তান সময়) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এই নিষেধাজ্ঞা কেবল যাত্রীবাহী বিমানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান এয়ারপোর্টস অথরিটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ভারতের মালিকানাধীন, ভারতীয় কোনো সংস্থা দ্বারা পরিচালিত কিংবা লিজ নেওয়া সকল প্রকার বেসামরিক ও সামরিক বিমানের ওপর এই বিধি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, কোনোভাবেই ভারতীয় কোনো উড়োজাহাজ পাকিস্তানের আকাশসীমা স্পর্শ করতে পারবে না।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে একটি রক্তাক্ত হামলার মধ্য দিয়ে। ওই ঘটনার পর ভারত সরকার কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ (Indus Waters Treaty) স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ভারতের এই সিদ্ধান্তের পাল্টা জবাব হিসেবে পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আকাশসীমা থেকে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে নিষিদ্ধ করে।
পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় গত ৩০ এপ্রিল ভারত সরকারও পাকিস্তানি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে বর্তমানে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আকাশপথে সরাসরি কোনো যোগাযোগ বা ট্রানজিট সুবিধা অবশিষ্ট নেই।
ভারত-পাকিস্তান আকাশসীমা সংকটের মূল ঘটনাক্রম:
| তারিখ/সময় | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা | প্রভাব |
| পেহেলগাম হামলা | হামলার পর দুই দেশের উত্তেজনা বৃদ্ধি। | কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি। |
| সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত | ভারত কর্তৃক জলবন্টন চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা। | পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ। |
| প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা | ৯ মাস আগে পাকিস্তান কর্তৃক আকাশসীমা বন্ধ। | ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্লাইটগুলোর পথ পরিবর্তন। |
| ভারতের পাল্টা পদক্ষেপ | ৩০ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা। | আকাশপথে দুই দেশের পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। |
| বর্তমান ঘোষণা | ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে মেয়াদের সম্প্রসারণ। | ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল। |
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আকাশসীমা বন্ধের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পরবর্তী বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের সময়ও উভয় দেশ একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদী রূপ পাওয়ায় আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সেক্টরে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভারতীয় বিমানগুলো বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আকাশপথ এড়িয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করছে। এর ফলে:
জ্বালানি খরচ: অতিরিক্ত পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে জ্বালানি খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
টিকিটের মূল্য: যাত্রীপ্রতি বিমান ভাড়ার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সময়ক্ষেপণ: বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পরিচালিত ফ্লাইটগুলোর সময় আগের তুলনায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বেশি লাগছে।
পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত মূলত ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আকাশপথ বন্ধের এই রাজনীতি উভয় দেশের এয়ারলাইন্সগুলোকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করছে। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখা যাওয়ায়, এই অঞ্চলের আকাশপথ ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোকেও বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনা জোরদার করতে হচ্ছে।