খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানজুড়ে চলমান নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে দেশটিতে গ্রেফতারকৃত ‘দাঙ্গাকারীদের’ বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া ও কঠোর শাস্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে দেশটির শীর্ষ কর্তৃপক্ষ। বিচার বিভাগীয় প্রধানের এই হুঁশিয়ারির পাশাপাশি দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬) এক বিশেষ বার্তায় ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই বিক্ষোভকারীদের কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে মোহসেনি-এজেই স্পষ্ট করে বলেন যে, সাম্প্রতিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিচার বিভাগের মূল কার্যক্রম এখন থেকেই শুরু হলো। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যিনি দয়া পাওয়ার যোগ্য নন, তাঁকে যদি অযথা ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা ন্যায়ের পরিপন্থী হবে।” তাঁর এই কঠোর মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন ইরান সরকার বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করেছে।
সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন এজেই। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে তিন শীর্ষ নেতা জানান যে, তথাকথিত ‘খুনি ও সন্ত্রাসী উসকানিদাতাদের’ বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র নমনীয়তা দেখানো হবে না। তবে যারা বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় ‘ভুলবশত’ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে, তারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কিছুটা ‘ইসলামি সহানুভূতি’ পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই দাবি করে আসছে যে, এই বিক্ষোভের নেপথ্যে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, বিদেশি এজেন্টরা বিক্ষোভকারীদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে দেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চাইছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাণিজ্যিক এলাকা (ডাউনটাউন) থেকে শুরু হওয়া দোকানদারদের এই আন্দোলন বর্তমানে ইরানের প্রায় সবকটি বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের বর্তমান বিক্ষোভ পরিস্থিতির একনজরে পরিসংখ্যান:
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| বিক্ষোভের সূত্রপাত | ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ (তেহরান থেকে)। |
| গ্রেফতার বা আটক সংখ্যা | আনুমানিক ১০,০০০+ জন। |
| সরকারের অভিযোগ | সন্ত্রাসবাদ, বিদেশি ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহ। |
| ইন্টারনেট স্থিতি | দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। |
| নিহতের সংখ্যা | কয়েক হাজার (সর্বোচ্চ নেতার ভাষ্যমতে)। |
| প্রধান দাবি | অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা। |
গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক ভাষণে জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার মানুষ’ নিহত হয়েছে। তবে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের দায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর না চাপিয়ে বরং বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের ওপর চাপিয়েছেন। তাঁর মতে, শত্রুরা ইরানকে অস্থিতিশীল করতে সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনের কারণেই নিহতের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বর্তমানে তেহরানের এভিন কারাগারসহ অন্যান্য বন্দিশালাগুলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কয়েদীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার প্রতিদিন নতুন নতুন গ্রেফতারের ঘোষণা দেওয়ায় জনমনে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিক্ষোভের খবর ও ভিডিও যাতে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ইরান সরকার কঠোরভাবে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করছে। রবিবার অল্প সময়ের জন্য আংশিক ইন্টারনেট চালু করা হলেও পরে তা অধিকাংশ মানুষের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, অন্যদিকে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি।
ইরানের এই বিক্ষোভ কেবল একটি সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং এটি দেশটির বর্তমান শাসনকাঠামোর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচার বিভাগের প্রধানের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গণ-বিচারের মাধ্যমে অনেক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল ইরানের এই মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ দমন নীতি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।