পুলিশের ওপর বাড়ছে সন্ত্রাসী হামলা, সাত মাসে আহত ৩৬১

ঢাকাসহ সারা দেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। আসামি গ্রেফতারে বাধা দেওয়া, হামলা চালিয়ে হ্যান্ডকাফসহ আসামি ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা পুলিশ সদস্যদের ওপর সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি সাভারে সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরি হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপ-পরিদর্শক আলতাফ হোসেন। বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় তাঁর ছেলেও বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ সদর দফতরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ৩৬১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ৭৬ ও ফেব্রুয়ারিতে ৬ জনসহ মোট ৮২ জন, মার্চে ৬৩, এপ্রিলে ৬৬, মে মাসে ৫৫, জুনে ৫১ এবং জুলাইয়ে ৪২ জন সদস্য আহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৫ সালেও দায়িত্ব পালনের সময় দেশজুড়ে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন ৬০১ জন পুলিশ সদস্য।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে আসামি ধরতে গিয়ে কিংবা নিয়মিত টহল পরিচালনাকালে এই হামলার শিকার হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় একটি নিয়মিত তল্লাশি চৌকিতে ককটেল হামলা ও এক কনস্টেবলকে ছুরিকাঘাত করে নব্য জেএমবির সদস্যরা। মে মাসে মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হয় ধানমন্ডি থানা-পুলিশের একটি দল। এর আগে পল্লবী থানার ওসিসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। একই মাসে রায়েরবাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় চারজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক; চট্টগ্রামে শীর্ষ সন্ত্রাসী ধরতে গিয়ে এবং পটুয়াখালীর লাউকাঠিতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের কোপে পুলিশের একাধিক সদস্য মারাত্মক আহত হন।
শুধু হামলা বা আঘাত নয়, পুলিশের হেফাজত থেকে অপরাধী ছিনিয়ে নেওয়ার মতো মারাত্মক ঘটনাও অহরহ ঘটছে। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় আসির মিয়া নামের এক আসামিকে তাঁর স্বজন ও সহযোগীরা ধস্তাধস্তি করে ছিনিয়ে নেয়। আসামি ছিনতাইয়ের পর ওই ব্যক্তি হাতকড়া পরা অবস্থাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে আসে, যদিও পরদিন জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেফতার করে। অনুরূপভাবে নরসিংদীর চরাঞ্চলে হত্যা মামলার আসামি সেলিম মুন্সিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় ৪০-৫০ জন লোক লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা চালিয়ে তাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। সম্প্রতি ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর ও মৌলভীবাজারেও হাতকড়াসহ আসামি ছিনতাই ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের বাধা ও হামলা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার সামিল। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে পুলিশের পেশাগত কাজে বাধা দিচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন এখন কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করছে। তবে মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, মাদক ও সন্ত্রাসী অভিযানে গিয়ে বারবার আক্রমণের শিকার হলে পরবর্তীতে কঠোর অভিযানে যেতে কর্মকর্তারা দ্বিধাবোধ করতে পারেন, যা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ার কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এমন হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মনে করেন, আসামি একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও সহজে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে যুক্ত হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরাধীদের মধ্যেও আইন অমান্য করার এক ধরনের নেতিবাচক আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠছে, যা সাধারণ মানুষকেও আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করতে পারে।
অবস্থা সামলে নিতে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন ও মনোবল ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আধুনিকায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাহিনীর দুর্বল হয়ে পড়া মনোবল চাঙ্গা করতে নিয়মিত অনুপ্রেরণা দেওয়া হচ্ছে। অপরাধ দমনে পুলিশের পূর্ণশক্তি প্রয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নানামুখী আইনি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে পুলিশের প্রতিপক্ষ না ভেবে দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।