বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এ তথ্য জানান। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মো. মুসলিম উদ্দিন (৩৯) ও শুকুর আহম্মদ (২৪)। এ ঘটনায় ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের তথ্যমতে, রাজা মিয়া ওরফে রাজু নিজের প্রথম বিয়ের কথা গোপন রেখে জান্নাতুলকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় তিনি নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর জান্নাতুল জানতে পারেন, রাজুর আগে থেকেই স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজু বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
জান্নাতুল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজুকে বিয়ে করেন তিনি। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানাধীন বাহির সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতেন।
ঝাড়ফুঁক করেও সমাধান না পেয়ে হত্যার পরিকল্পনা
পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করার আগে রাজু তাঁর পূর্বপরিচিত মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। পরে তাঁরা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের কাছে গিয়ে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। তবে এতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তাঁরা হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে জানা গেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজু বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মুসলিম উদ্দিন, রাজুর প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও এক ব্যক্তি।
পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তাঁরা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালের দিকে যায়। পিবিআইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ৮টার পর নৌকার মধ্যে রাজু ও জান্নাতুলের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে রাজু জান্নাতুলের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন।
এরপর তিনি জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন। এ সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এক সহযোগী নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার পর জান্নাতুলের মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে তাঁর হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে লাশটি শিকলবাহা খালে ফেলে দেওয়া হয়।
পিবিআই জানায়, কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের অংশে লাশটি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাট এলাকায় ফিরে যান এবং আত্মগোপনে চলে যান।
বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর হত্যা মামলা
ঘটনার কয়েক দিন পর, গত ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন নদীতে ভাসমান অবস্থায় এক নারীর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। লাশটির হাত-পা বাঁধা ছিল। সে সময় ওই নারীর পরিচয় জানা যায়নি।
পরে পরিবারের সদস্যরা লাশটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলাটির তদন্তভার গত ৬ অক্টোবর পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো গ্রহণ করে। এরপর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেনের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় তদন্ত শুরু হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় অভিযুক্তদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালান।
টেকনাফে আত্মগোপনে থাকা দুজন গ্রেফতার
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকেও গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
অন্যদিকে, গ্রেফতার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন রাখাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ কীভাবে একটি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিল, তা পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।


