প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরের দিনই জেলার ডুমুরিয়া উপজেলায় চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার একটি চায়ের দোকানে ঢুকে তরিকুল ইসলাম শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত তরিকুল ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম শেখের ছেলে। প্রকাশ্য স্থানে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুর পৌনে ২টার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় গফফারের চায়ের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। একই দিন বিকেল ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাগেরহাট থেকে সড়কপথে খুলনায় প্রবেশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের কয়েক ঘণ্টা আগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তরিকুল ইসলাম শেখ গফফারের চায়ের দোকানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। দুপুরের ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ সেখানে দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। হামলার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকান ও আশপাশের এলাকায় থাকা লোকজনের মধ্যে ভয়ভীতি তৈরি হয়। তবে হামলাকারীরা কারা, কী উদ্দেশ্যে তারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং ঘটনার পর তারা কোন দিকে পালিয়ে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিহত তরিকুলের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বাবা আব্দুস সালাম শেখ ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা কিংবা অন্য কোনো কারণে এ হামলা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনার খবর পেয়ে ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার হাফিজুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ সেখানে পৌঁছে ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
খুলনা জেলার পুলিশ সুপার ওমর ফারুকও ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একজন যুবক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে তিনি খবর পেয়েছেন। কী কারণে তাঁকে গুলি করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরের দিনেই এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত একটি পরিবারের সদস্যকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সফরের কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। দুটি ঘটনা একই দিনে ঘটেছে বলেই সেগুলোর মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এর আগে গত ২২ অক্টোবরও প্রধানমন্ত্রীর সুন্দরবন পরিদর্শন, দাকোপে অবতরণ ও মোংলা সফরের দিন খুলনায় পরপর দুটি গুলির ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। ওই দিন ভোরে খুলনা মহানগরীর মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় তুষার (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন সন্ধ্যায় জিন্নাহ পাড়া এলাকায় মায়ের সামনে খুশি আক্তার নামে এক তরুণীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
একই মাসে প্রধানমন্ত্রীর সফরকেন্দ্রিক সময়ে খুলনা অঞ্চলে একাধিক গুলির ঘটনায় প্রাণহানির বিষয়টি জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ডুমুরিয়ার তরিকুল ইসলাম শেখ হত্যার ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা। চায়ের দোকানের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে কীভাবে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে পালিয়ে গেল, ঘটনাস্থলে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রাসঙ্গিক আলামত রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার কথা। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা বলে সংবাদে উল্লেখ নেই; তাই এ বিষয়ে কোনো দাবি বা বক্তব্য নিশ্চিতভাবে আরোপ করা যাচ্ছে না।
পুলিশের তদন্তে হত্যার পেছনের কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কত দ্রুত এগোয় এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী পদক্ষেপ নেয়।


