সীমানা কিংবা ভাষার প্রাচীর যে ভালোবাসার কাছে পরাস্ত হতে পারে, তার আরও একটি বাস্তব প্রমাণ মিলল শরীয়তপুরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গড়ে ওঠা দীর্ঘ চার বছরের প্রেমের সম্পর্ককে পরিণতি দিতে পাকিস্তান থেকে সুদূর শরীয়তপুরের জাজিরায় ছুটে এসেছেন এক যুবক। গত শনিবার (১১ জুলাই) শরিয়াহ সম্মত উপায়ে বাংলাদেশি তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। আর বিয়ের পর এই নবদম্পতি এখন একসঙ্গে পাকিস্তানে পাড়ি জমানোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রোমাঞ্চকর এই ঘটনাটি এখন জেলাজুড়ে রীতিমতো টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
ফেসবুক থেকে ছাদনাতলা: চার বছরের প্রেম
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরের নাম মোজাম্মেল হোসাইন (২৬)। তিনি পাকিস্তানের লাহোর শহরের বাসিন্দা। অন্যদিকে কনে তানজিলা আক্তার (১৯) শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর ইউনিয়নের স্টাপল্টন শিকদার কান্দি এলাকার রমিজ উদ্দিনের মেয়ে।
প্রায় চার বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তানজিলা ও মোজাম্মেলের প্রথম পরিচয় ঘটে। এরপর মেসেঞ্জারে নিয়মিত কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে তা গভীর প্রেমে রূপ নেয়। দিন যত গড়িয়েছে, দুজনের সম্পর্ক ততই মজবুত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা ঘর বাঁধার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই দীর্ঘ বিমান পথ পাড়ি দিয়ে গত ১১ জুলাই মোজাম্মেল সরাসরি জাজিরায় তানজিলার বাড়িতে এসে হাজির হন। সেখানে পারিবারিকভাবে স্থানীয় কাজি ও ইমামের উপস্থিতিতে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
শঙ্কা ও স্বস্তির দোলাচলে দুই পরিবার
গতকাল মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) তানজিলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। সেখানে নবদম্পতির সাথে কথা বলে তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানা যায়। তানজিলার মা আসমা আক্তার জানান, বিয়ের আগে থেকেই জামাই মোজাম্মেলের পরিবারের সদস্যদের সাথে তাঁরা নিয়মিত ভিডিও কলে যোগাযোগ রাখতেন। মোজাম্মেলের পাসপোর্ট, ভিসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁরা নিজেদের দায়িত্বে যাচাই-বাছাই করেছেন। নিজের আদরের মেয়েকে এত দূরে ভিনদেশে পাঠিয়ে দিতে মায়ের বুক কিছুটা কাঁপলেও ছেলের পরিবারের ভালো ব্যবহারের কারণে তাঁরা আশ্বস্ত হয়েছেন। আপাতত কোনো বড় ধরনের শঙ্কা তাঁদের মনে নেই।
তবে এই বিয়ে নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এলাকার প্রতিবেশীদের একাংশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও অনেকেই কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিয়ের নামে বিদেশে নিয়ে গিয়ে মানবপাচারের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রায়ই গণমাধ্যমে আসছে। যেহেতু বর মোজাম্মেলের পরিবারের কোনো অভিভাবক বা সদস্য এই বিয়েতে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না, তাই তানজিলাকে পাকিস্তানে পাঠানোর আগে প্রশাসনিকভাবে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
ভিনদেশি যুবকের জাজিরায় এসে বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসনও। জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহমেদ এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে জানান, বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ আগে থেকে সুনির্দিষ্টভাবে অবগত ছিল না। তবে খবর পাওয়ার পরই তাঁরা তৎপর হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সংবেদনশীলতা বিবেচনায় বরের পাসপোর্ট, ভিসা এবং বিয়ে সংক্রান্ত সমস্ত বৈধ কাগজপত্র যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হবে। যদি কোনো আইনি বা সুরক্ষাজনিত ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত এলাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ বিষয়টি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।



