শনিবার রাতেও নিজের ঘরে বসে এইচএসসি পরীক্ষার শেষ মুহূর্তের প্রাকটিস ও রিভিশন দিচ্ছিলেন রামদয়াল সরকার (১৮)। সকালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পরীক্ষার হলে বসা আর হলো না তাঁর। বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে রাতে ঘর থেকে বের হয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশ হয়ে ফিরতে হলো এই শিক্ষার্থীকে; একই সাথে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর বাবাও।
বগুড়ার ছিলিমপুর এলাকায় রোববার সকালে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় রামদয়াল সরকার এবং তাঁর বাবা তাপস কুমার সরকার (৪৩) নিহত হন। হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে তখন, যখন রামদয়াল তাঁর বাবার বিকল হয়ে যাওয়া ট্রাক মেরামতের কাজে সহযোগিতা করতে বগুড়া শহরে পৌঁছেছিলেন। শেরপুর পৌরসভার রামচন্দ্রপুর পাড়ায় বসবাসকারী তাপস কুমার পেশায় একজন পরিবহন ব্যবসায়ী ছিলেন। নিজের মালিকানাধীন দুটি ট্রাকের একটি তিনি নিজেই চালাতেন। শনিবার রাতে ছিলিমপুর এলাকায় ট্রাকটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা রাস্তার পাশে বিকল হয়ে পড়ে। ট্রাক মেরামতের জন্য বাড়ি থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে বাবার কাছে ছোটেন রামদয়াল। কিন্তু সেখানে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিকল ট্রাকটিকে অন্য একটি দ্রুতগামী ট্রাক পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতায় ঘটনাস্থলেই বাবা ও ছেলেসহ মোট তিনজন প্রাণ হারান।
রামদয়াল শেরপুরের সামিট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের একজন নিয়মিত ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের এই তরুণকে নিয়ে পরিবারের বড় আশা ছিল। কিন্তু মুহূর্তের দুর্ঘটনায় সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে।
একসাথে পরিবারের দুজন উপার্জনক্ষম ও সম্ভাবনাময় সদস্যকে হারিয়ে রামচন্দ্রপুর পাড়ায় এখন শোকের মাতম চলছে। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা স্তব্ধ হয়ে ভিড় করেছেন তাঁদের বাড়িতে। একমাত্র সন্তান ও স্বামীকে একসাথে হারিয়ে মা দিপালী রানী সরকার (৩৫) বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। চেতনার কিছুটা ফিরলেই বিলাপ করে উঠছেন, “আমার তো আর কেউ রইল না, কাকে নিয়ে বাঁচব!”
অন্যদিকে নাতি ও ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন ৮০ বছর বয়সী আনন্দমোহন সরকার। তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে আক্ষেপ করে জানান, তাঁদের আসল ভিটেবাড়ি ছিল সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের মোড়দিয়া গ্রামে। কেবল নাতি রামদয়ালকে শেরপুরের ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ১৫ বছর আগে তারা ভিটেমাটি ছেড়ে শেরপুরে চলে এসেছিলেন। আজ ছেলে ও নাতিকে হারিয়ে এক নিঃস্ব ও অসহায় জীবন কাটানোর শঙ্কায় প্রবীণ এই মানুষটি আকুল হয়ে উঠছেন।
পারিবারিক সূত্র ও স্বজন সাগর কুমার রায় জানিয়েছেন, পুলিশি তদন্ত ও আইনি প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাবা-ছেলের মরদেহ তাঁদের সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের আদি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে, সেখানেই তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
মন্তব্য