জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ই আগস্ট ২০২৬, ৯:২১ পিএম
সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালুর স্বপ্ন আট বছর ধরে ঝুলে আছে। ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এর মধ্যে কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ মূল প্রকল্পের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ৬ হাজার ৮৬২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ১২৩ শতাংশ।
শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোও বদলে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্পটির বড় অংশ ভারতের ঋণে করার কথা ছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করে বিকল্প অর্থায়নের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এখন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভারতীয় ঋণ বাতিল করা হলেও এখন একই প্রকল্পের ব্যয় আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ব্যয় এত বাড়ল কেন?
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, শুধু ভারতীয় ঋণ বাতিলের কারণে ব্যয় ১২৩ শতাংশ বাড়েনি। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া, জমির দাম বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম ও ডলারের বিনিময় হার বাড়া এবং পরামর্শক ব্যয় বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কারণে নতুন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পে প্রায় ৮৭ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে লুপ লাইন, দুটি বড় নদীর ওপর সেতু, ২২১টি ছোট-বড় সেতু, রেল ওভারপাস, জংশন ও নতুন স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিন্তু অনুমোদনের পর প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ ও নকশা চূড়ান্ত করতেই কয়েক বছর চলে যায়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পরামর্শক নিয়োগের পর ২০২৩ সালের জুনে চূড়ান্ত নকশা করা হয়। এর মধ্যে প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এখন সংশোধিত ডিপিপিতে আবারও চার বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রকল্প অনুমোদনের আট বছর পরও মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
২০১৮ সালের প্রকল্পে ভারতের ঋণ ছিল ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। মূল প্রকল্প ব্যয়ের হিসাবে এটি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত এই প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করে। পরে প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এআইআইবির সঙ্গে এগোনোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ভারতীয় ঋণ বাতিলের পেছনে রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, এই সিদ্ধান্তের কারণে প্রকল্পের পুরো ব্যয় ১২৩ শতাংশ বেড়েছে এমনটা বলা যায় না। কারণ প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির কিছু কারণ অর্থায়ন পরিবর্তনের আগেই তৈরি হয়েছিল।
প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০১৮ সালের দামে করা হিসাবও পরে আর কার্যকর থাকেনি।
ভূমি অধিগ্রহণের হিসাবেও পরিবর্তন এসেছে। মূল ডিপিপিতে ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। পরে চূড়ান্ত নকশা ও অ্যালাইনমেন্টের পর প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ কমে ৯০১ দশমিক ৭৭ একরে দাঁড়ায়।
কিন্তু জমির পরিমাণ কমলেও অধিগ্রহণের খরচ কমেনি। বরং সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত প্রাক্কলনে এই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
অর্থাৎ জমি অধিগ্রহণে মূল হিসাবের চেয়ে ৩২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা বেশি লাগছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, জমির মূল্য বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। এরই মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দুই জেলার জেলা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্পের পরামর্শক খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মূল ডিপিপিতে এ খাতে ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই খাতে ব্যয় বেড়েছে ১৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এআইআইবির অর্থায়নে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি পরামর্শ, নকশা যাচাই ও তদারকির প্রয়োজন হয়েছে। এ কারণেও পরামর্শক খাতে ব্যয় বেড়েছে।
তবে এই খাতে এত বড় ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্প মূল্যায়নের সময় সংশ্লিষ্টদের কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে প্রকল্পটি যখন অনুমোদন হয়, তখনকার বাজারদর ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এরপর আট বছরে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারেও বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিঞা বলেছেন, এসব কারণে আগের ব্যয়ে এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
তবে শুধু বাজারদর বৃদ্ধিই ৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা বাড়ার পুরো ব্যাখ্যা নয়। জমি অধিগ্রহণ, পরামর্শকসহ বিভিন্ন খাতে নতুন করে ব্যয় নির্ধারণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে প্রকল্পের রুট পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আসে। বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে রেললাইন না নিয়ে রানীরহাট জংশন থেকে গাবতলী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এর সঙ্গে নতুন ভূমি অধিগ্রহণ, আন্ডারপাস, ওভারপাস, রানীরহাটে বাইপাস এবং গাবতলী রেলস্টেশন আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব ছিল।
তবে এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। গত ১৬ জুন রেল মন্ত্রণালয় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রুট পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করে মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। পরে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানান, রুট নিয়ে তৈরি হওয়া বিষয়টির সমাধান হয়েছে এবং প্রকল্পের রুটে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
তাই প্রস্তাবিত ওই ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বর্তমান ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ব্যয়ের মধ্যে ধরা হয়নি।
প্রকল্পের তথ্য পর্যালোচনা করলে ব্যয় বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়।
প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ২০১৮ সালে অনুমোদনের পরও মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এতে পুরোনো দামের হিসাব আর বর্তমান বাজারের সঙ্গে মিলছে না।
দ্বিতীয়ত, জমির দাম বেড়েছে। জমির প্রয়োজনীয় পরিমাণ কমলেও অধিগ্রহণ ব্যয় ৩২৩ কোটি টাকা বেড়েছে।
তৃতীয়ত, নির্মাণসামগ্রী ও ডলারের দাম বেড়েছে। আট বছর আগের বাজারদরে এখন কাজ করা সম্ভব নয়।
চতুর্থত, অর্থায়ন পরিবর্তন হয়েছে। ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এআইআইবির অর্থায়নে যাওয়ার কারণে প্রকল্পের পরামর্শক ও কারিগরি কাজের ব্যয় বেড়েছে।
পঞ্চমত, প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে নতুন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর ভূমি অধিগ্রহণসহ কিছু খাতে আগের হিসাব পরিবর্তন হয়েছে।
এই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির দায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ থাকলেও তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
২০১৮ সালে প্রকল্প নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে না পারার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পরে ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করে নতুন অর্থায়নে যাওয়ার সিদ্ধান্তও প্রকল্পের কাঠামো বদলেছে।
আবার বর্তমান সরকার ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার সংশোধিত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে এখন এই ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করা এবং আবার যেন সময় ও ব্যয় না বাড়ে, সেই দায়িত্বও বর্তমান সরকারের।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটি এখন ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আট বছরে ব্যয় বেড়েছে ১২৩ শতাংশ।
সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন হলে দরপত্র আহ্বান চরাচজসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে নির্মাণকাজ শুরু করার কথা।
প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ডিপিপি অনুমোদনের পর দরপত্রসহ পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষ করে মূল নির্মাণকাজ শুরু করতে আরও প্রায় নয় মাস লাগতে পারে।
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জে সরাসরি রেলপথ না থাকায় বর্তমানে ট্রেনকে ঘুরে চলতে হয়। নতুন রেলপথ হলে দুই জেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে এবং ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের এই অংশের রেল যোগাযোগও সহজ হবে।
তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে প্রকল্প ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকায় করার কথা ছিল, সেটি ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে শেষ পর্যন্ত কত দিনে বাস্তবায়ন হয়।
মন্তব্য