বাঁকা জল-অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা-শুভ জন্মদিন-নন্দিত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন

বাংলা কথাসাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনে ইমদাদুল হক মিলন এক উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র নাম। গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সাংবাদিকতা—সৃজনশীলতার নানা শাখায় তাঁর দীর্ঘ পথচলা বাংলা ভাষার পাঠকসমাজকে দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় সৃষ্টি। সহজ-সরল ভাষা, জীবনের কাছাকাছি চরিত্র, আবেগের গভীরতা এবং মানুষের সুখ-দুঃখের অন্তরঙ্গ অনুরণন তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

নন্দিত এই কথাসাহিত্যিকের জন্ম ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে, নানাবাড়িতে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পয়শা গ্রামে। পিতা গিয়াসউদ্দিন খান এবং মাতা আনোয়ারা বেগম।

শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতা, গ্রামীণ জীবন, মানুষের অন্তর্গত টানাপোড়েন এবং সমাজবাস্তবতার নানা রং পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সাহিত্যের পথে প্রথম পদচিহ্ন

শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্যজগতে প্রবেশ। ‘কিশোর বাংলা’ পত্রিকায় শিশুতোষ গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর লেখকজীবন। পরে ১৯৭৭ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় ‘সজনী’ গল্প প্রকাশের মাধ্যমে তিনি ব্যাপকভাবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সেই যে যাত্রা শুরু—তারপর আর থেমে থাকেননি তিনি। একের পর এক গল্প, উপন্যাস, নাটক ও অন্যান্য রচনার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক।

‘বাঁকা জল’ পেরিয়ে ‘নূরজাহান’

ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যভুবন বিচিত্র ও বহুমাত্রিক। ‘অধিবাস’, ‘পরাধীনতা’, ‘কালাকাল’, ‘বাঁকা জল’, ‘নিরন্নের কাল’, ‘পরবাস’, ‘কালো ঘোড়া’, ‘মাটি ও মানুষের উপাখ্যান’, ‘পর’, ‘কেমন আছ সবুজপাতা’, ‘জীবনপুর’—এমন বহু গ্রন্থ তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর বহন করে।

তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘নূরজাহান’ দুই বাংলার পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তাঁর কথাসাহিত্যের শক্তি, মানবিকতা ও জীবনঘনিষ্ঠতার এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি বড় শক্তি হলো—তিনি মানুষের খুব কাছে গিয়ে মানুষকে দেখেছেন। তাঁর চরিত্রগুলো কেবল গল্পের পাতা থেকে উঠে আসা কাল্পনিক মানুষ নয়; তাদের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, স্বপ্ন-ব্যর্থতা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম—সবকিছুতেই পাঠক নিজের জীবন ও চারপাশের মানুষের ছায়া খুঁজে পান।

নাট্যকার হিসেবেও উজ্জ্বল

কথাসাহিত্যের পাশাপাশি নাট্যকার হিসেবেও ইমদাদুল হক মিলনের রয়েছে অনন্য জনপ্রিয়তা। তাঁর দেড় শতাধিক নাটকের মধ্যে ‘কোন কাননের ফুল’, ‘বারো রকম মানুষ’, ‘রূপনগর’, ‘যুবরাজ’, ‘কোথায় সেজন’, ‘আলতা’, ‘একজনা’, ‘নীলু’, ‘তোমাকেই’, ‘ছোঁয়া কদম’, ‘আঁচল’, ‘খুঁজে বেড়াই তারে’, ‘কোন গ্রামের মেয়ে’, ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’ প্রভৃতি নাটক দর্শকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর নাটকের চরিত্র ও গল্প একসময় ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। ফলে তিনি শুধু বইয়ের পাঠকের লেখক নন—তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষেরও আপনজন।

সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা

সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতাতেও তাঁর দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-এর সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। লেখকসত্তা ও সাংবাদিকসত্তা—দুই পরিচয়েই তিনি বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাহিত্যাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।

পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে ইমদাদুল হক মিলন পেয়েছেন বহু সম্মাননা ও পুরস্কার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার — ১৯৯২
কাজী মাহবুবউল্লাহ পুরস্কার — ২০১৮
একুশে পদক — ২০১৯

বাংলা একাডেমির সরকারি তালিকায় ১৯৯২ সালে ইমদাদুল হক মিলনের নাম সামগ্রিক অবদানের জন্য সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে রয়েছে।

আর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’ লাভ তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

একজন মানুষের গল্প, হাজার মানুষের অনুভূতি

ইমদাদুল হক মিলনের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই—তিনি মানুষের কথা বলেছেন। প্রেমের কথা বলেছেন, বিচ্ছেদের কথা বলেছেন; বলেছেন গ্রামবাংলার মাটি ও মানুষের কথা, বলেছেন শহুরে জীবনের নিঃসঙ্গতার কথা। তাঁর কলমে কখনো নদী হয়ে এসেছে জীবন, কখনো মানুষ হয়ে উঠেছে গল্পের কেন্দ্র, কখনো বা ইতিহাস ও সময় এসে দাঁড়িয়েছে চরিত্রের পাশে।

‘বাঁকা জল’ যেন তাঁর সাহিত্যযাত্রারও এক প্রতীক—জীবনের সোজা পথ সবসময় সোজা থাকে না; কোথাও বাঁক আছে, কোথাও স্রোতের টান, কোথাও অন্ধকার, কোথাও আলো। সেই বাঁকানো জল পেরিয়েই একজন লেখক পৌঁছে যান মানুষের হৃদয়ের কাছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা, সৃষ্টিশীলতা ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান।

শুভ জন্মদিন, প্রিয় কথাশিল্পী।

আপনার কলম আরও বহুদিন মানুষের হৃদয়ের কথা বলুক।
আপনার সৃষ্টির ভুবন আরও সমৃদ্ধ হোক।
জীবনের প্রতিটি নতুন বাঁক পেরিয়ে আপনি পৌঁছে যান আরও নতুন সৃষ্টির তীরে।

ফেসবুক পরিবারের পক্ষ থেকে
নন্দিত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

শুভ জন্মদিন, প্রিয় কথাশিল্পী।
শুভ হোক আপনার আগামী দিনের প্রতিটি অধ্যায়।
জন্ম: ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫
জন্মস্থান: মেদিনীমণ্ডল, বিক্রমপুর
পরিচয়: কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সাংবাদিক
উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২), একুশে পদক (২০১৯)

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।