বাংলাদেশ থেকে বিদায়ের পর প্রাণনাশের হুমকি পেলেন জোনস

এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ব্যর্থতার পর বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব হারানোর চার দিন পর মুখ খুলেছেন জেরার্ড জোনস। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশে কাজ করার সময় তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং এমনকি মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে দলের দায়িত্ব থেকে জোনসকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ৪ সেপ্টেম্বর। এর আগে বাছাইপর্বে বাংলাদেশ টানা দুই ম্যাচে হারের মুখ দেখে। সিরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের পরাজয়ের পরই তাঁর সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় বাফুফে।

তবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ বাফুফের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে শুধু জানানো হয়, বাছাইপর্বের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে থাকা চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

জোনস অবশ্য নিজের বক্তব্যে দায়িত্ব হারানোর প্রসঙ্গের পাশাপাশি বাংলাদেশে কাজ করার সময়কার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, ফুটবল নিয়ে সিদ্ধান্তের সমালোচনা স্বাভাবিক হলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস কিংবা প্রাণনাশের হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জানান, এ ধরনের একাধিক বার্তা তাঁর কাছে এসেছে।

নিজের পারিবারিক পরিচয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন জোনস। তিনি বলেন, তিনি একজন স্বামী, বাবা এবং সন্তান। ফলে মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলার বিষয়টি তিনি আলাদা করে দেখছেন।

জোনসকে দায়িত্ব থেকে সরানোর পেছনে ফলাফলের পাশাপাশি দলের ভেতরের একটি ঘটনার কথাও সামনে এসেছিল। বাফুফের একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট টিম হোটেলে সহকারী কোচ আতিকুর রহমানের সঙ্গে জোনসের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তা ধাক্কাধাক্কিতে গড়ায়। পরে জোনস নিজেই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন।

বাংলাদেশে নিজের স্বল্প সময়ের দায়িত্বকালকে শুধু দুটি ম্যাচের ফল দিয়ে বিচার করতে রাজি নন জোনস। তাঁর দাবি, দলটির সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি যুব খেলোয়াড়দের উন্নয়ন, স্থানীয় কোচ তৈরি, প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং প্রবাসী বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের সম্পৃক্ত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি।

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের সঙ্গে প্রায় নয় সপ্তাহ কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এরপরই তাঁকে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় দল নিয়ে মাঠে নামতে হয়। জোনসের মূল্যায়ন, প্রস্তুতির সময়ের বিচারে বাংলাদেশ এমন কিছু দলের বিপক্ষে খেলেছে, যাদের খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত।

তবে অল্প সময়ের মধ্যেও অনুশীলনে দলের কিছু অগ্রগতি দেখেছিলেন বলে দাবি করেছেন এই কোচ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বলের দখল ধরে রাখা, আক্রমণে বৈচিত্র্য আনা, প্রতিপক্ষের বক্সে নিয়মিত প্রবেশ, উঁচু চাপ সৃষ্টি এবং বল হারানোর পর দ্রুত চাপ প্রয়োগ—এসব ক্ষেত্রে অনুশীলনে দল উন্নতি করছিল।

সমস্যা তৈরি হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে সেই পরিকল্পনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে। জোনসের মতে, অনুশীলনে যে ধরনের ফুটবল দলটি তৈরি করেছিল, ম্যাচে তার ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। ফলে প্রস্তুতির সময় গড়ে তোলা কৌশল ও মাঠের বাস্তব পারফরম্যান্সের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।

নিজের প্রায় দুই দশকের কোচিং অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন জোনস। তাঁর মতে, অল্প সময়ের দায়িত্ব এবং মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফল দিয়ে তাঁর দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ার কিংবা বাংলাদেশে করা কাজের পুরো মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মূল্যায়নে, এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে শুধু জাতীয় দলের প্রস্তুতিতে পরিবর্তন আনলেই হবে না। খেলোয়াড় বাছাইয়ের পদ্ধতি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো, ফুটবল সংস্কৃতি এবং উচ্চপর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অধ্যায় শেষ হলেও দেশের ফুটবল ও খেলোয়াড়দের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন জোনস। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই এবং ফুটবল নিয়ে মানুষের আগ্রহও প্রবল। সেই প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজে লাগাতে হলে ধারাবাহিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত সময় এবং খেলোয়াড়দের বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

জোনসের এই বক্তব্যের পর তাঁর দায়িত্ব হারানো, দলের ফলাফল এবং বাংলাদেশে কাজের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর উত্থাপিত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও হুমকির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।