খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ বলে দাবি করার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। তার এই বক্তব্যের পর তার নির্বাচনী হলফনামা ও পারিবারিক তথ্য প্রকাশ্যে আসায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। হলফনামার তথ্যানুযায়ী, এই সংসদ সদস্যের জন্ম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ১০ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮১ সালে। তাছাড়া স্থানীয় সূত্র ও বাস্তব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, তার বাবা ও মা দুজনেই বর্তমানে জীবিত আছেন।
গত রোববার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম তার নিজের পরিবার এবং নিকটাত্মীয়দের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার হিসেবে দাবি করেন। সংসদে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন:
শহীদ পরিবার দাবি: সংসদ সদস্য দাবি করেন যে তার বাবা এবং তার দাদা উভয়েই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।
পরিবারে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা: তিনি বলেন যে তার পরিবারে সর্বমোট ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে তার বাবারা ৭ ভাই, যাদের মধ্যে ৪ জন সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
দাদা ও মায়ের ভূমিকা: তিনি আরও দাবি করেন যে তার দাদারা ১৯ জন এবং তাদের মধ্যে ১১ জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। একই সঙ্গে তার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সংসদ সদস্যের এই আবেগঘন ও নাটকীয় বক্তব্যের পরই সচেতন মহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দাখিল করা অফিসিয়াল হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তার নথিবদ্ধ বয়স ছিল ৪৪ বছর ১১ মাস ২০ দিন।
সরকারি নথিপত্র ও হলফনামা অনুযায়ী, আব্দুল মুনতাকিমের প্রকৃত জন্মতারিখ হলো ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ১০ বছর পর জন্ম নেওয়া কোনো ব্যক্তি কীভাবে নিজেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান’ হিসেবে দাবি করতে পারেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ, হাস্যরস এবং তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সংসদে তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন বলে দাবি করলেও স্থানীয় সূত্র এবং পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে প্রমাণিত হয়েছে। স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সংসদ সদস্যের বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী এবং মা মোসলমান বেগম দুজনেই বর্তমানে জীবিত আছেন।
তারা বর্তমানে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামে অবস্থিত নিজ বাসভবনে তাদের সন্তান অর্থাৎ সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিমের সঙ্গেই বসবাস করছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার যে তথ্য সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া নীলফামারী-৪ আসনের এই সংসদ সদস্যের শিক্ষাগত ও পেশাগত জীবনের কিছু তথ্য জানা গেছে। আব্দুল মুনতাকিম শৈশবে ধর্মীয় শিক্ষার অংশ হিসেবে কুরআন হেফজ সম্পন্ন করেন এবং একজন হাফেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায়ও অংশ নেন এবং সেখান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার এবং জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে তিনি সৈয়দপুর আল ফারুক একাডেমিতে একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সংসদে নিজের পরিবার ও শহীদ হওয়ার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পর সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, সংসদে বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত তার মুখ থেকে ভুল তথ্য এবং ভুল শব্দ উচ্চারিত হয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিভ্রান্তিকর ভুলের জন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আরও জানিয়েছেন যে, জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী বা অফিশিয়াল রেকর্ড থেকে এই ভুল বক্তব্য ও তথ্যটি বাদ দিয়ে সংশোধনের জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আব্দুল মুনতাকিমের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মো. শফিকুল ইসলাম একটি বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি এই ঘটনাটিকে ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখ ফসকে হয়ে যাওয়া একটি ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি আরও জানান যে, সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম তার নির্বাচনী এলাকায় ফিরে আসার পর স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মুখোমুখি হবেন এবং এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। তবে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা তথা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের বাবা-মায়ের জীবন ও দেশের ইতিহাস সম্পর্কে এমন দায়িত্বহীন ও অসত্য তথ্য উপস্থাপন করায় সচেতন মহল তার সংসদীয় দায়িত্বশীলতা ও সততা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন।
| বিবরণের বিষয় | সংসদে সংসদ সদস্যের দাবি | হলফনামা ও স্থানীয় সূত্রের প্রকৃত তথ্য |
| বাবার বর্তমান অবস্থা | ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ | বর্তমানে জীবিত এবং ছেলের সঙ্গেই বসবাস করছেন |
| সংসদ সদস্যের জন্মসাল | ১৯৭১ সালের পূর্বে (দাবি অনুযায়ী) | ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি (হলফনামা অনুযায়ী) |
| পরিবারে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা | ৪৭ জন (পিতা, দাদা, চাচা ও ফুফাতো ভাইসহ) | যাচাইবিহীন ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে প্রমাণিত |
| মায়ের ভূমিকা | মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক | বর্তমানে জীবিত ও কামারপুকুর ইউনিয়নে অবস্থানরত |