খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৮:৫৪ এএম
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বারইপুরে ১২ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নৃশংস এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র জনরোষ, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তের স্বার্থে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে জেলা পুলিশ।
সোমবার ভোরে বারইপুর এলাকা থেকে পালানোর চেষ্টা করার সময় প্রধান অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে এই মামলায় প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার নামে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, প্রভাস মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার এবং দিবাকর সর্দারের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার বিকেলে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারইপুর থানার ধপধপি এলাকার সূর্যপুর হাটের বাসিন্দা ১২ বছর বয়সী শিশুটি এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, পথিমধ্যে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ তাকে জোর করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মেয়েটির কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বারইপুর থানায় নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করলেও প্রথমদিকে শিশুটির কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরদিন রোববার ভোরে শিশুটির বাড়ির কাছের একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ সামনে আসায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা শিশুটির মরদেহ সড়কে রেখে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন এবং রেলপথ অবরোধ করে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
ক্রমেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা পুলিশ বারইপুর, সোনারপুর ও নরেন্দ্রপুর এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হলেও বিক্ষোভ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
ঘটনার তদন্তে গতি আনতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল, আলামত এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে পুরো ঘটনার ধারাবাহিকতা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার সঙ্গে আর কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে এই মর্মান্তিক ঘটনার জেরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলটির নেতা দোলা সেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা শোক প্রকাশের পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
অন্যদিকে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী এবং শমীক লাহিড়ীর নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তাঁরাও পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এ ঘটনার প্রতিবাদ চলাকালে রোববার বিক্ষুব্ধ জনতা সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনাও পৃথকভাবে তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বারইপুরের এই ঘটনা শুধু স্থানীয় মানুষকেই নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এক শিশুর এমন নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিখোঁজের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
মন্তব্য