মর্যাদাপূর্ণ প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কার গ্রহণ করতে বৃহস্পতিবার স্ত্রী আন্তোনেল্লা রোক্কুস্সোকে সঙ্গে নিয়ে স্পেনের ওভিয়েদো শহরে পৌঁছান মেসি। এ সময় ভক্তদের উচ্ছ্বাস ও করতালিতে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। শুক্রবার ক্রীড়া বিভাগে এই সম্মাননা গ্রহণ করার কথা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের।
স্পেনে অবস্থানকালে সংবাদ সংস্থা ইএফইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্সেলোনায় কাটানো দীর্ঘ সময়ের স্মৃতিচারণ করেন তিনি। মেসির কাছে সেই সময়ের আনন্দ কেবল ম্যাচ জেতা কিংবা ট্রফি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সতীর্থদের সঙ্গে প্রতিদিনের অনুশীলন, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং দল হিসেবে সাফল্য উদ্যাপনের মুহূর্তগুলোও তাঁর কাছে সমান মূল্যবান।
মেসি বলেন, “আমরা ভাগ্যবান ছিলাম যে, সবকিছু জিততে পেরেছিলাম। যেভাবে আমরা খেলেছি, জয় উপভোগ করেছি এবং গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু অর্জন করেছি, তা ছিল দারুণ। তবে সবচেয়ে বড় কথা, আমরা প্রতিদিনের জীবন ও অনুশীলনের সময়গুলোও দারুণভাবে উপভোগ করেছি; আমরা খুব ভালো সময় কাটিয়েছি।”
তাঁর এই বক্তব্যে ফুটবলের বাইরের একটি দিকও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পেশাদার খেলোয়াড়দের সাফল্য সাধারণত গোল, ম্যাচ ও শিরোপার হিসাব দিয়ে বিচার করা হয়। কিন্তু মেসির স্মৃতিতে বার্সেলোনার দিনগুলো জায়গা করে নিয়েছে সতীর্থদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এবং একসঙ্গে কাটানো আনন্দময় সময়ের কারণেও।
বার্সেলোনায় রেকর্ড ও শিরোপার রাজত্ব
বার্সেলোনায় মেসির যাত্রা শুরু হয়েছিল কৈশোরে। দীর্ঘ পথচলায় তিনি নিজেকে ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। দলটির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।
বার্সেলোনার জার্সিতে মেসি জিতেছেন ১০টি লা লিগা ও চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও অনেক ট্রফি তাঁর অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ব্যক্তিগত সাফল্যের দিক থেকেও তিনি অনন্য। রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জিতে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও সম্মানিত খেলোয়াড়দের একজন হয়ে উঠেছেন এই আর্জেন্টাইন।
বার্সেলোনার হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স ক্লাবটিকে দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপীয় ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সাহায্য করেছে। অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, গোল করার দক্ষতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সমর্থকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে।
বিচ্ছেদ ছিল অনিচ্ছার, স্মৃতি রয়ে গেছে অমলিন
বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির সম্পর্কের সমাপ্তি অবশ্য সুখকর ছিল না। ক্লাবটির আর্থিক সংকট ও চুক্তি নিবন্ধনের জটিলতার কারণে ২০২১ সালের আগস্টে তাঁকে বিদায় নিতে হয়। শৈশব থেকে যে ক্লাবের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, সেখান থেকে সরে যাওয়ার ঘটনা সমর্থকদের পাশাপাশি মেসির জন্যও ছিল আবেগঘন।
বার্সেলোনা ছাড়ার পর তিনি ফরাসি ক্লাব প্যারিস সাঁ-জাঁতে যোগ দেন। সেখানে দুই মৌসুম কাটিয়ে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে পাড়ি জমান। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে নিজের নতুন অধ্যায় গড়ে তুলছেন তিনি।
তবে পেশাদার জীবনে নতুন পরিবেশে থিতু হলেও বার্সেলোনার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধন অটুট রয়েছে। শহরটিতে তাঁর তিন সন্তানের জন্ম। ফলে এই জায়গার সঙ্গে তাঁর পরিবারের স্মৃতি, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ জড়িয়ে আছে।
মেসি নিজেই বলেছেন, বার্সেলোনা তাঁর কাছে কী অর্থ বহন করে, তা “অল্প কথায় প্রকাশ করা কঠিন”। এই মন্তব্যে ফুটবলীয় সাফল্যের পাশাপাশি শহরটির প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত টানও ফুটে উঠেছে।
বর্তমানে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেললেও বার্সেলোনায় কাটানো সময় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য সমর্থকের কাছে মেসি যেমন অসাধারণ ফুটবল প্রতিভার প্রতীক, তেমনি বার্সেলোনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কও ফুটবল ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়।
স্পেনে ফিরে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে মেসি আবারও বুঝিয়ে দিলেন, জীবনের কিছু সম্পর্ক শুধু অর্জন কিংবা পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। বার্সেলোনা তাঁর কাছে তেমনই এক জায়গা—যেখানে ফুটবলের সাফল্যের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে জীবনের অমূল্য সব স্মৃতি।


