ঘটনাটি ঘটেছে দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে। এটি বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্মস্থান উজানধল গ্রামের কাছাকাছি এলাকা। ভাটি অঞ্চলের লোকসংগীত ও বাউল ঐতিহ্যের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে থাকায় তাঁর এলাকার কাছাকাছি এমন একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, হাতিয়া গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী তাঁর মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আসর আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন। সেখানে স্থানীয় দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নীলার গান পরিবেশন করার কথা ছিল। তবে অনুষ্ঠানটি ঘিরে আপত্তি ওঠার পর শেষ পর্যন্ত তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
লিখিত আবেদনে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গ
অনুষ্ঠান বন্ধের দাবিতে গত বুধবার দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলামের কাছে লিখিত আবেদন করেন আতাহার আলী ও কামরুল হাসান। তাঁরা গ্রামবাসীর পক্ষে আবেদনটি করেছেন বলে জানা গেছে।
আবেদনে হাতিয়া গ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করা হয়। আবেদনকারীদের দাবি, গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্য অনুসরণ করে আসছে। সেখানে একটি আলিম মাদ্রাসা ও একজন ওলির মাজার রয়েছে। পাশাপাশি, গ্রামে অনেক আলেম-ওলামার বসবাস এবং প্রতিবছর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আবেদনকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে গানের আসর অনুষ্ঠিত হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তাঁরা।
অভিযোগকারী কামরুল হাসান বলেন, তাঁদের গ্রামে আগে গানবাজনার আয়োজন হলেও বর্তমানে এ ধরনের অনুষ্ঠান হয় না। তাঁর ভাষ্য, মসজিদ-মাদ্রাসা এবং নিয়মিত ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে গ্রামের ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে উঠেছে। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের আয়োজন হলে গ্রামবাসীর একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
কামরুল হাসানের দাবি, কয়েকজনের ধারণা ছিল, গানের নামে অশ্লীলতা হতে পারে। এ কারণে তাঁরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে প্রস্তাবিত আসরে অশ্লীল পরিবেশনা হওয়ার কোনো প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিবেচনায় আয়োজকের সিদ্ধান্ত
আপত্তির বিষয়টি জানার পর পুলিশ আয়োজক শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে তিনি অনুষ্ঠানটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।
শওকত আলী জানান, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে পরিবারের বাড়িতে সীমিত পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন তিনি। কিন্তু অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি ওঠে এবং থানা থেকে ফোন করা হয়। এরপর সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি আর অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেননি।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন, এটি ছিল একটি ঘরোয়া বাউলগানের আয়োজন। আপত্তি ওঠার পর পুলিশ আয়োজকের সঙ্গে কথা বলে। পরে আয়োজক নিজেই পুলিশকে জানান, তিনি আর গানবাজনার আয়োজন করবেন না।
অর্থাৎ, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আয়োজক নিজেই অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। তবে এ ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে স্পষ্ট তথ্য নেই।
মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বাতিলের ঘটনার সঙ্গে মিল
দিরাইয়ে বাউলগানের আসর বাতিলের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন এর আগে একই উপজেলায় মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ আয়োজন নিয়েও আপত্তি উঠেছিল।
এর আগে ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র বাধার মুখে দিরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করতে হয়েছিল। গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আপত্তির মুখে খেলাটি আর মাঠে গড়ায়নি। ওই ঘটনা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়।
দুটি ঘটনার ধরন আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই স্থানীয় আপত্তির কারণে সাংস্কৃতিক আয়োজন ও মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা, সামাজিক রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি
বাউলগানের আসর বাতিলের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আগে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল, এবার একটি পক্ষের আপত্তিতে বাউলগানের আয়োজন বন্ধ হলো। পরপর দুটি আয়োজন স্থানীয় আপত্তির কারণে বাতিল বা স্থগিত হওয়া দুঃখজনক।
জাহাঙ্গীর আলমের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলে আপত্তি তোলা হলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বাউলগান দীর্ঘদিন ধরে লোকজ সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক ভাবনা ও মানুষের জীবনবোধ প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে বাউল ও লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। শাহ আবদুল করিমের গান মানুষের প্রেম, বিরহ, জীবনসংগ্রাম, মানবতা ও সমাজবাস্তবতার নানা দিক তুলে ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেছে।
এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে মতপার্থক্য দেখা দিলে তা কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সামাল দেওয়া যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি উঠলেই যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে না যায়, সে বিষয়েও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
দিরাইয়ের সাম্প্রতিক দুই ঘটনা তাই কেবল একটি গানের আসর বা একটি ফুটবল ম্যাচ বাতিলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষের মতামত, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্ব হবে আইনসম্মত উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, সম্ভাব্য বিরোধ এড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট সবার অধিকার ও নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখা।


