স্মরণে নাগরিক জীবনের কবি শামসুর রাহমান

বাংলা কবিতার এক অনন্য কণ্ঠস্বর, স্বাধীনতার কবি ও নাগরিক জীবনের ভাষ্যকার

কিছু কবি থাকেন, যাঁরা শুধু কবিতা লেখেন না—কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে ধারণ করেন একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম, দ্রোহ, প্রেম ও বেদনা। তাঁদের কবিতায় কথা বলে সময়, প্রতিবাদী হয়ে ওঠে বিবেক, আর শব্দের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠে একটি দেশের আত্মপরিচয়। কবি শামসুর রাহমান তেমনই এক অনন্য কবি, যাঁর কবিতায় বাংলাদেশের ইতিহাস, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং স্বদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা হয়ে উঠেছে অনিঃশেষ শিল্পভাষ্য।

জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯২৯ সালে, পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে। বিশ শতকের বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান এই কবি শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময়জুড়ে তাঁর সৃষ্টিশীল অভিযাত্রা বাংলা কবিতাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা, আধুনিক মনন ও নাগরিক অনুভূতির এক সমৃদ্ধ ভুবন।

জীবনানন্দ দাশ-পরবর্তী বাংলা কবিতার ধারায় শামসুর রাহমান নিঃসন্দেহে অন্যতম প্রধান কবি। নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও প্রকৃতি, মানুষের অস্তিত্বসংকট, সামাজিক অসংগতি, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—বহুমাত্রিক বিষয় তাঁর কবিতায় পেয়েছে গভীর শিল্পরূপ। সহজ অথচ ব্যঞ্জনাময় শব্দচয়ন, আধুনিক কাব্যভাষা এবং সময়কে ধারণ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

শামসুর রাহমান ছিলেন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক সাহসী কবিকণ্ঠ। পাকিস্তানি শাসনামলের বৈষম্য, স্বৈরাচারী শাসনের দমন-পীড়ন, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এবং মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা বারবার প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তাঁর কাছে কবিতা কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টির শিল্প ছিল না; কবিতা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখার সাহস এবং বিবেককে জাগিয়ে রাখার এক অনিবার্য অঙ্গীকার।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তাঁর কবিতা স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে জুগিয়েছে সাহস ও প্রেরণা। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের আকাঙ্ক্ষা, আত্মত্যাগ ও স্বপ্নকে ধারণ করে আছে। স্বাধীনতা তাঁর কাছে কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়—স্বাধীনতা ছিল মানুষের মর্যাদা, অধিকার, মুক্তচিন্তা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি।

তাঁর কবিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্বদেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধের পাশাপাশি স্বদেশের অসংগতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নির্মোহ সমালোচনা। ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’—এই শিরোনামেই যেন ধরা পড়ে এক অস্থির সময়ের প্রতি কবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ক্ষোভ ও হতাশা। দেশ যখন আদর্শচ্যুতি, অনিয়ম ও মূল্যবোধের সংকটে বিপর্যস্ত, তখন কবির শব্দ হয়ে ওঠে বিবেকের আয়না। তাঁর কবিতার আবেদন তাই কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিটি সংকটাপন্ন সময়ে তা নতুন অর্থে ফিরে আসে।

শামসুর রাহমান শুধু কবিতায় নয়, গদ্য, প্রবন্ধ, কলাম ও অনুবাদেও রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। তাঁর সাহিত্যকর্মের ব্যাপ্তি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক বিকাশকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। তবে সব স্বীকৃতির ঊর্ধ্বে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন—পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন এবং বাংলাদেশের সাহিত্য-ইতিহাসে অমোচনীয় উপস্থিতি।

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় এই মহান কবির জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু কবির মৃত্যু হয়, কবিতার নয়। সময়ের সীমানা পেরিয়ে তাঁর শব্দ আজও আমাদের ভাবায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে এবং স্বদেশকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখায়।

আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বাংলা কবিতার এই অনন্য শিল্পীকে। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, যত দিন মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, তত দিন শামসুর রাহমানের কবিতা আমাদের সাহস ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

কবিতার আকাশে আপনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, শামসুর রাহমান। আপনার শব্দে জেগে থাকুক স্বদেশ, আপনার কবিতায় বেঁচে থাকুক মানুষের মুক্তির স্বপ্ন।

কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।