কিছু সাহিত্যিক থাকেন, যাঁরা তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সার্বজনীন রূপ দেন। প্রেম, বিরহ, শৈশবের অপূর্ণতা, জীবনের না-পাওয়া, স্বপ্নভঙ্গ আর সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতা—সবকিছুকে তাঁরা এমন ভাষায় প্রকাশ করেন, যা পাঠকের নিজের জীবনেরই গল্প হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের তেমনই এক অসামান্য স্রষ্টা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রেম যেমন গভীর ও বহুমাত্রিক, তেমনি রয়েছে জীবনকে নতুন করে আবিষ্কারের আকুলতা, সমাজ ও সময়কে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের অন্তর্জগতের নিপুণ রূপায়ণ।
১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলার ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। দেশভাগের অভিঘাত, শৈশবের স্মৃতি এবং পরবর্তী জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক মননকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তীকালে কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যজীবন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক ধারায় তিনি হয়ে ওঠেন এক শক্তিশালী, স্বতন্ত্র ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।
১৯৫৩ সালে কয়েকজন তরুণ কবির সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কৃত্তিবাস’ কবিতাপত্রিকা। এই পত্রিকা হয়ে ওঠে বাংলা কবিতার নতুন প্রজন্মের পরীক্ষানিরীক্ষা, আধুনিক চিন্তা ও নতুন কাব্যভাষা নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে জীবন, প্রেম, নগরসভ্যতা ও ব্যক্তিমানুষের অনুভূতিকে নতুনভাবে প্রকাশের যে প্রবণতা আধুনিক বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছিল, সুনীল ছিলেন তার অন্যতম অগ্রপথিক।
কবিতা ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা, কিন্তু সৃষ্টিশীলতার পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল না কোনো একটি সাহিত্যশাখায়। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, সাহিত্যসমালোচনা ও শিশুসাহিত্য—প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। তাঁর লেখার সহজ, সাবলীল অথচ আকর্ষণীয় ভাষা পাঠককে সহজেই টেনে নিত। সাধারণ জীবনের পরিচিত ঘটনা ও অনুভূতিকেও তিনি এমন শিল্পদক্ষতায় উপস্থাপন করতেন যে, তার মধ্যে পাঠক খুঁজে পেতেন নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্যে ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, ‘অর্ধেক জীবন’, ‘আত্মপ্রকাশ’ এবং ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, নবজাগরণ, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে পটভূমি করে রচিত ‘সেই সময়’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আনন্দ পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
‘নীললোহিত’—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক স্মরণীয় সাহিত্যিক পরিচয়। এই ছদ্মনামে সৃষ্ট চরিত্র ও রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে এক স্বাধীনচেতা, ভবঘুরে, কৌতূহলী ও জীবনপিপাসু মানুষের প্রতিচ্ছবি। নীললোহিত যেন চেনা পৃথিবীর ভেতরেই অচেনাকে খুঁজে বেড়ান; কখনো পথের মানুষ, কখনো নিঃসঙ্গ পর্যটক, কখনো জীবনের গভীর রহস্যের অনুসন্ধানী। এ ছাড়া তিনি ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীল উপাধ্যায়’ নামেও লিখেছেন।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর সৃষ্ট কাকাবাবু চরিত্রটিও বিশেষভাবে জনপ্রিয়। সাহসী, অনুসন্ধিৎসু ও অভিযাত্রী এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন রোমাঞ্চ, ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং অজানাকে আবিষ্কারের আনন্দের সঙ্গে। কাকাবাবুর অভিযান আজও বাংলা ভাষার অসংখ্য পাঠকের শৈশব ও কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক সত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। দেশভাগের অভিজ্ঞতা, দুই বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং বাংলা ভাষার অভিন্ন ঐতিহ্য তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুরে, আর সাহিত্যিক জীবনের প্রধান কর্মক্ষেত্র কলকাতা—এই দুই ভূগোলের মধ্যে তাঁর জীবন যেন বাংলা ভাষারই এক সেতুবন্ধন। রাজনৈতিক সীমারেখা দুই বাংলাকে আলাদা করলেও ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আত্মীয়তা যে অটুট, তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্ম সেই সত্যকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ভারতের জাতীয় সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সাহিত্য আকাদেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নতুন লেখকদের উৎসাহিত করা, সাহিত্যচর্চার পরিসরকে সমৃদ্ধ করা এবং বাংলা সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর কলকাতায় ৭৮ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারায় এমন একজন স্রষ্টাকে, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক ও অগণিত পাঠকের প্রিয় লেখক। কিন্তু প্রকৃত সাহিত্যিকের মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি ঘটাতে পারে না। বইয়ের পাতায়, পাঠকের স্মৃতিতে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত সাহিত্যপ্রেমে তিনি বেঁচে থাকেন।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বাংলা সাহিত্যের এই বহুমাত্রিক প্রতিভাকে। তাঁর সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছে—জীবনের অপূর্ণতা সত্ত্বেও স্বপ্ন দেখতে হয়, বিচ্ছেদের মধ্যেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে, আর মানুষের অনুভূতির কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত নেই।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন দুই বাংলার হৃদয়ের কাছাকাছি থাকা এক সাহিত্যিক সেতুবন্ধন। তাঁর কলম থেমেছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির যাত্রা থামেনি। বাংলা ভাষা যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন পাঠকের হৃদয়ে তিনি ফিরে আসবেন নতুন কোনো কবিতায়, নতুন কোনো গল্পে, কিংবা জীবনের কোনো অচেনা বাঁকে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি প্রিয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে।


