খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৮:৪৯ এএম
নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশিটি যখন বাজল, তখন মাঠের সবুজ ঘাস ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্বের সমস্ত আলো গিয়ে পড়ল ৩৪ বছর বয়সী এক মহাতারকার ওপর। তিনি নেইমার জুনিয়র। আরও একবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে, এবার কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই শেষ ১৬-র মঞ্চে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের এত শুরুর দিকে বিদায় নেওয়ার ল্যামিনেটেড এক কালো অধ্যায় যুক্ত হলো সেলেসাওদের ইতিহাসে। আর এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের রাতেই কান্নাভেজা চোখে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিলেন নেইমার। বিদায়ের এই ক্ষণটি তার জন্য যেমন বেদনার এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড এনে দিয়েছে, তেমনই এনে দিয়েছে পেলের পাশে বসার এক সুখকর অমরত্ব।
ম্যাচের শুরু থেকেই কার্লো আনচেলত্তির কৌশল আর সেলেসাওদের আক্রমণভাগের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট ছিল। চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমারকে প্রথমার্ধে সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়। একের পর এক সুযোগ নষ্ট করার চড়া মূল্য দিতে হয় ব্রাজিলকে; নরওয়ে দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। অবশেষে ম্যাচের ৬৭ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার। দীর্ঘ চোটের কারণে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের বিপক্ষে সব মিলিয়ে তিনি মাত্র ৩৬ মিনিট খেলার সুযোগ পান। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে নেইমার ব্যবধান কমালেও তা দলের হার এড়াতে পারেনি। ম্যাচ শেষ হতেই মাঠের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই ফরোয়ার্ড, যা কোটি ফুটবল ভক্তের বুক কাঁপিয়ে দেয়।
এই হারের সাথে সাথে নেইমারের নামের পাশে যুক্ত হয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও ট্র্যাজিক রেকর্ড। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ (২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬) খেলেও কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ট্রফি ছোঁয়া হলো না তার। এর আগে এই রেকর্ডটি একচ্ছত্রভাবে ছিল ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভার, যিনি ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলেছিলেন কিন্তু শিরোপা পাননি।
অথচ ব্রাজিলের জার্সিতে চার বা তার বেশি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড রয়েছে পেলে, কাফু, রোনালদো নাজারিও, নিলটন সান্তোস, লেয়াও, কাস্তিলহো এবং দালমা সান্তোসের। কিন্তু নেইমার ও সিলভার ট্র্যাজেডি এখানেই যে, এই তালিকার বাকি প্রতিটি কিংবদন্তি তাদের ক্যারিয়ারে অন্তত একবার হলেও বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন।
বেদনার মহাসমুদ্রেও নেইমার নিজের প্রতিভার এক অনন্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ফুটবলের রাজা পেলের পর একমাত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি গোলটিই তাকে পেলের পাশে এই রাজকীয় আসনে বসিয়েছে, যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখকর কীর্তি হিসেবে অমর হয়ে থাকবে।
যদি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই ম্যাচটিই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে, তবে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি নিজের দখলে রেখেই বুট জোড়া তুলে রাখছেন। নিচে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচক | অর্জিত ডেটা ও পরিসংখ্যান |
| মোট আন্তর্জাতিক ম্যাচ | ১৩০টি |
| সর্বমোট গোল (ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ) | ৮০টি |
| মোট অ্যাসিস্ট (গোল করানো) | ৫৮টি |
| অংশগ্রহণকৃত বিশ্বকাপের আসর | ৪টি (২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) |
| বিশ্বকাপের ভিন্ন ভিন্ন আসরে গোল | ৪টি (পেলের পর একমাত্র ব্রাজিলিয়ান) |
| জাতীয় দলের হয়ে প্রধান টুর্নামেন্ট শিরোপা | ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশনস কাপ |
| অনূর্ধ্ব-২৩ বা অলিম্পিক দলের বড় অর্জন | ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক |
| চার বা তার বেশি বিশ্বকাপ খেলা ব্রাজিলিয়ানরা | পেলে, কাফু, রোনালদো, সিলভা, নিলটন সান্তোস, লেয়াও, কাস্তিলহো, দালমা সান্তোস |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলার সংখ্যা | ২টি (বনাম স্কটল্যান্ড ও নরওয়ে) |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে থাকা মোট সময় | ৩৬ মিনিট |
“এখানেই শুরু, এখানেই শেষ”— ম্যাচ শেষে অবসরের ইঙ্গিত দিয়ে নেইমারের এই একটি বাক্যই যেন এক যুগের এক সোনালী ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের যবনিকা টেনে দিল। ট্রফিহীন এক বুক ভরা আক্ষেপ আর কিছু অনন্য রেকর্ডের মিশ্রণে ব্রাজিলের ‘পোস্টার বয়’-এর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ফুটবল ইতিহাসের এক পরম ট্র্যাজেডি হয়েই টিকে থাকবে।
মন্তব্য